ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল একটি যুগের প্রতিনিধি নন। তাঁরা তাঁদের সময়কে পেরিয়ে ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেন।
ইবনে খালদুন ছিলেন তেমনই একজন।
তিনি রাজা ছিলেন না, কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ছিলেন না যুদ্ধজয়ী সেনাপতি। তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল বাহিনী। অথচ রাজদরবার, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাসন, কারাবাস এবং সভ্যতার উত্থান-পতন তাঁকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছিল, যা কোনো পাঠশালায় একা বসে অর্জন করা সম্ভব ছিল না।
তিনি মানুষকে দেখেছিলেন ক্ষমতার খুব কাছে থেকে।
দেখেছিলেন কীভাবে একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কীভাবে সম্পদ জমা হয়। কীভাবে করের বোঝা বাড়তে বাড়তে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। কীভাবে বিলাসিতা একটি বিজয়ী জাতির চরিত্র বদলে দেয়। আর কীভাবে যে জনগোষ্ঠী একসময় সাম্রাজ্য গড়ে, কয়েক প্রজন্ম পর তারাই সেই সাম্রাজ্যের ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল ছিল একটি গ্রন্থ।
আল-মুকাদ্দিমা।
আর সেই গ্রন্থের লেখক আবু যায়দ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন।
আজ তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রদূত, ইতিহাসচিন্তার এক বিপ্লবী নাম এবং অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাথমিক পথিকৃৎ হিসেবে পড়ানো হয়। কিন্তু তাঁর নিজের জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই চিন্তাগুলো কোনো আরামকেদারায় বসে জন্ম নেয়নি।
এগুলো জন্ম নিয়েছিল অস্থিরতার ভেতর।
তিউনিসের সেই তরুণ
১৩৩২ সাল।
উত্তর আফ্রিকার তিউনিসে জন্ম নিলেন ইবনে খালদুন। তাঁর পরিবার ছিল আন্দালুসীয় বংশোদ্ভূত, শিক্ষিত এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রভাবশালী।
শৈশব থেকেই তিনি এমন একটি পরিবেশে বড় হন যেখানে জ্ঞান ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ।
আরবি ভাষা, কুরআন, ফিকহ, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, সাহিত্য ও ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে অল্প বয়সেই।
কিন্তু তাঁর সামনে তখনও অন্যরকম একটি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছিল।
মাত্র কৈশোর পেরোতেই তাঁকে রাজদরবারে প্রবেশ করতে হয়।
তখনকার উত্তর আফ্রিকায় রাজনীতি ছিল স্থির কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। সুলতান বদলাতেন, মন্ত্রী বদলাতেন, জোট বদলাত, আনুগত্য বদলাত। একটি দরবারে যে ব্যক্তি আজ ক্ষমতার কেন্দ্রে, কালই সে বন্দি হতে পারত।
ইবনে খালদুন খুব দ্রুত এই বাস্তবতা বুঝতে শুরু করেন।
রাজদরবার তাঁকে শুধু প্রশাসনের ভাষা শেখায়নি।
শিখিয়েছে ক্ষমতার প্রকৃতি।
রাজদরবারের চাকরি, নাকি আত্মার পরাজয়?
তরুণ ইবনে খালদুন রাজকীয় চিঠিপত্র লেখা ও প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হলেন। তাঁর হাতে আসতে লাগল রাষ্ট্রীয় নথি, গোপন বার্তা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নানা দিক।
কাগজে-কলমে এটি ছিল সম্মানের পদ।
কিন্তু ইবনে খালদুন বুঝতে শুরু করলেন, রাজদরবারে জ্ঞানী হওয়া আর স্বাধীনভাবে চিন্তা করা এক জিনিস নয়।
ক্ষমতার কাছে থাকা মানুষকে অনেক কিছু দেখতে দেয়। আবার অনেক কিছু বলতে বাধাও দেয়।
তিনি একদিকে সুলতানের আস্থা অর্জন করছিলেন, অন্যদিকে দরবারের ঈর্ষা ও ষড়যন্ত্রেরও মুখোমুখি হচ্ছিলেন।
কারণ দরবারে প্রতিভা সবসময় আশীর্বাদ নয়।
কখনো কখনো সেটিই হয়ে ওঠে বিপদ।
ইবনে খালদুনের জীবন বারবার এই সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে।
তিউনিস থেকে প্রথম যাত্রা
রাজনৈতিক সন্দেহ ও দরবারি দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত তাঁকে তিউনিস ছাড়তে বাধ্য করল।
তাঁর সামনে ছিল উত্তর আফ্রিকার বিস্তৃত রাজনৈতিক ভূগোল।
এক শহর থেকে আরেক শহর।
এক সুলতানের দরবার থেকে আরেক সুলতানের দরবার।
আজ উপদেষ্টা, কাল দূত, কখনো প্রশাসক, কখনো বন্দি।
ইবনে খালদুন যেন নিজের চোখের সামনে একটি জীবন্ত রাজনৈতিক পরীক্ষাগার দেখতে পেলেন।
এখানে রাষ্ট্র ছিল তাঁর গবেষণার বিষয় নয়।
রাষ্ট্রই ছিল তাঁর জীবন।
মরক্কোর কারাগারে
মরক্কোতে গিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কিন্তু খুব দ্রুতই ক্ষমতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি কারাগারে গেলেন।
মাসের পর মাস।
একুশ মাস পর্যন্ত বন্দিত্ব তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।
একজন সাধারণ রাজদরবারের কর্মচারীর জন্য কারাগার হয়তো জীবনের সমাপ্তি।
ইবনে খালদুনের জন্য তা হয়ে উঠল একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়।
কারাগারের দেয়াল তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিলেও, মানুষের আচরণ সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণকে আরও গভীর করল।
তিনি দেখলেন, ক্ষমতা মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়।
দেখলেন আনুগত্য কীভাবে স্বার্থের সঙ্গে বদলায়।
দেখলেন, রাষ্ট্রের শক্তি কখনো বাহিনীতে, কখনো অর্থে, কখনো মানুষের পারস্পরিক সংহতিতে নিহিত।
পরে তাঁর চিন্তায় যে ‘আসাবিয়্যাহ’ ধারণাটি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তার বাস্তব অভিজ্ঞতার অনেকটাই এই অস্থির রাজনৈতিক জীবন থেকে এসেছিল।
আসাবিয়্যাহ বলতে মোটামুটি বোঝানো যায় একটি গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সংহতি, পারস্পরিক আনুগত্য ও সম্মিলিত শক্তি।
একটি গোষ্ঠী যখন ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন তারা দুর্বল থেকেও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে।
কিন্তু যখন সম্পদ, বিলাসিতা ও ক্ষমতা সেই সংহতিকে ক্ষয় করে দেয়, তখন পতনের শুরু হয়।
ইবনে খালদুন এই তত্ত্ব বই থেকে শেখেননি।
তিনি এটি জীবন থেকে দেখেছিলেন।
গ্রানাডা: আরেক দরবার, আরেক ষড়যন্ত্র
এরপর তাঁর যাত্রা তাঁকে নিয়ে গেল আন্দালুসিয়ার গ্রানাডায়।
চতুর্দশ শতকের গ্রানাডা ছিল মুসলিম আন্দালুসের শেষ বড় রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোর একটি।
সেখানেও ইবনে খালদুন দ্রুত নিজের মেধার পরিচয় দেন।
তিনি হয়ে ওঠেন সুলতানের উপদেষ্টা এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধি।
কাস্তিলের রাজা পেদ্রো প্রথমের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু আবারও সেই পুরোনো গল্প।
ক্ষমতার কাছে থাকা।
তারপর ঈর্ষা।
তারপর সন্দেহ।
তারপর দূরত্ব।
গ্রানাডায় তাঁর সঙ্গে লিসান আল-দীন ইবন আল-খতিবের সম্পর্কও জটিল হয়ে ওঠে। তাঁরা দুজনই ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানী মানুষ। কিন্তু রাজদরবারে দুই প্রতিভার সহাবস্থান সবসময় সহজ হয় না।
ইবনে খালদুন আবারও বুঝলেন, একটি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক যুদ্ধ কখনো কখনো তার সীমান্তে হয় না।
হয় প্রাসাদের ভেতরে।
এক শহর থেকে আরেক শহর
তিউনিস।
মরক্কো।
গ্রানাডা।
আলজেরিয়া।
একটি শহর তাঁকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারছিল না।
কখনো রাজনীতি তাঁকে তাড়িয়েছে।
কখনো ষড়যন্ত্র।
কখনো নিজের অস্থির মন।
আর কখনো তিনি নিজেই বুঝেছেন, ক্ষমতার ভেতরে থেকে তাঁর কাজ সম্পূর্ণ হবে না।
এই ঘুরে বেড়ানো জীবন তাঁকে একটি অসাধারণ সুবিধা দিয়েছিল।
তিনি কোনো একটি রাজবংশের ইতিহাস দেখেননি।
তিনি দেখেছিলেন বহু রাজবংশের পুনরাবৃত্তি।
একই গল্প বারবার ঘটতে দেখেছিলেন।
একদল মানুষ কঠোর জীবনযাপন করে শক্তিশালী হয়।
তারা ক্ষমতা অর্জন করে।
তারপর শহরে আসে।
সম্পদ বাড়ে।
বিলাসিতা বাড়ে।
রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ে।
কর বাড়ে।
সামাজিক সংহতি কমে।
আর কয়েক প্রজন্ম পর সেই রাষ্ট্র এমন এক জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে বাইরের কোনো শক্তি এসে তাকে সরিয়ে দেয়।
ইবনে খালদুনের কাছে ইতিহাস তাই শুধু রাজাদের নাম ও যুদ্ধের তালিকা ছিল না।
ইতিহাসের পেছনে ছিল কারণ।
আর সেই কারণ খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর আসল কাজ।
ইবন সালামাহর দুর্গ
১৩৭৫ সাল।
রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে ইবনে খালদুন আশ্রয় নিলেন আলজেরিয়ার দুর্গ ইবন সালামাহতে।
এখানেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
শহরের কোলাহল নেই।
দরবার নেই।
মন্ত্রী নেই।
ষড়যন্ত্র নেই।
ক্ষমতার প্রতিদিনের হিসাব নেই।
আছে শুধু একজন চিন্তাশীল মানুষ, তাঁর কলম এবং বহু বছরের অভিজ্ঞতা।
চার বছরের এই নির্জনতা থেকেই জন্ম নিল এমন একটি গ্রন্থ, যা ইতিহাসচর্চার গতিপথ বদলে দিতে যাচ্ছিল।
আল-মুকাদ্দিমা।
ইতিহাস কি শুধু রাজাদের গল্প?
ইবনে খালদুনের সময় ইতিহাস লেখা হতো মূলত রাজা, যুদ্ধ, বংশপরম্পরা ও রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
কোন রাজা কখন ক্ষমতায় এলেন।
কোন যুদ্ধ কখন হলো।
কে কাকে পরাজিত করল।
কোন রাজবংশের পরে কোন রাজবংশ এল।
ইবনে খালদুন বললেন, এতটুকু দিয়ে ইতিহাস বোঝা যায় না।
কারণ একটি ঘটনা ঘটার পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ থাকে।
একটি রাষ্ট্র কেন শক্তিশালী হয়?
একটি শহর কেন সমৃদ্ধ হয়?
কেন কোনো জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করে?
কেন রাজবংশের পতন ঘটে?
কেন কর বাড়ালে কখনো রাষ্ট্রের আয় কমে যায়?
কেন বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়ে বা কমে?
মানুষ কেন একসঙ্গে থাকে?
কেন তারা একসময় নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়ে?
এই প্রশ্নগুলোই ইবনে খালদুনকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
তিনি ইতিহাসের ঘটনাকে শুধু বর্ণনা করতে চাননি।
তিনি তার কারণ খুঁজতে চেয়েছিলেন।
আসাবিয়্যাহ: সভ্যতার অদৃশ্য শক্তি
ইবনে খালদুনের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণাগুলোর একটি হলো আসাবিয়্যাহ।
একটি গোষ্ঠীর মধ্যে যখন পারস্পরিক সংহতি, আনুগত্য এবং সম্মিলিত উদ্দেশ্য থাকে, তখন সেই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়।
কঠোর জীবনযাপনে অভ্যস্ত মরু বা যাযাবর জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সংহতি শক্তিশালী হতে পারে।
তারা সংগ্রাম করে।
তারা একে অন্যের ওপর নির্ভর করে।
তাদের প্রয়োজন কম।
তাদের লক্ষ্য পরিষ্কার।
ফলে তারা একটি প্রতিষ্ঠিত কিন্তু বিলাসিতায় অভ্যস্ত নগররাষ্ট্রকে পরাজিত করতে পারে।
কিন্তু ক্ষমতা অর্জনের পর পরিস্থিতি বদলায়।
পরবর্তী প্রজন্মগুলো আর আগের কষ্টের জীবন দেখে না।
তারা প্রাসাদে জন্ম নেয়।
সম্পদ তাদের সহজলভ্য হয়।
রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দেয়।
ধীরে ধীরে যে সংহতি তাদের পূর্বপুরুষদের ক্ষমতায় এনেছিল, সেটিই ক্ষয়ে যেতে থাকে।
ইবনে খালদুনের চোখে এখানেই সভ্যতার এক অদ্ভুত চক্র শুরু হয়।
যে শক্তি রাষ্ট্রকে গড়ে তোলে, সময়ের সঙ্গে সেই রাষ্ট্রের জীবনযাপনই কখনো কখনো সেই শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
অর্থনীতির কথাও বলেছিলেন তিনি
ইবনে খালদুন শুধু রাজনীতি নিয়ে ভাবেননি।
তিনি অর্থনীতি নিয়েও বিস্ময়করভাবে আধুনিক কিছু পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
শ্রমের মূল্য কীভাবে তৈরি হয়?
বাজারে চাহিদা ও সরবরাহ কীভাবে কাজ করে?
উৎপাদন বাড়লে শহরের সমৃদ্ধি কীভাবে বাড়ে?
অতিরিক্ত কর অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে?
এসব প্রশ্ন তিনি তাঁর সময়ের বহু আগে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেন।
করনীতি সম্পর্কে তাঁর একটি বিখ্যাত পর্যবেক্ষণের সারমর্ম হলো:
রাষ্ট্রের শুরুতে তুলনামূলক কম কর থেকেও বেশি রাজস্ব আসতে পারে, কারণ মানুষ উৎপাদন ও ব্যবসায় উৎসাহিত থাকে।
কিন্তু রাষ্ট্র যখন দুর্বল হতে থাকে, তখন রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে করের হার বাড়াতে থাকে।
ফলে উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়ে।
শেষ পর্যন্ত করের হার বাড়লেও কর থেকে পাওয়া মোট আয় কমে যেতে পারে।
আজকের অর্থনীতির ভাষায় এর সঙ্গে করহার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনাগুলো করা হয়, তার সঙ্গে ইবনে খালদুনের পর্যবেক্ষণের একটি আকর্ষণীয় সাদৃশ্য দেখা যায়।
ছয় শতাব্দী আগে একজন মুসলিম ইতিহাসবিদ বুঝেছিলেন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি শুধু কোষাগারে থাকা অর্থের নাম নয়।
অর্থনীতি হলো মানুষের উৎপাদন, শ্রম, বাজার ও প্রণোদনার সম্মিলিত ফল।
কায়রোতে খালদুন
১৩৮২ সালের দিকে ইবনে খালদুন মিসরের কায়রোতে পৌঁছালেন।
এটি ছিল তাঁর জীবনের আরেক বড় অধ্যায়।
কায়রো তখন জ্ঞান, বাণিজ্য ও প্রশাসনের বিশাল কেন্দ্র।
আল-আজহারসহ অসংখ্য মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্রে পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীদের সমাগম।
ইবনে খালদুন এখানেও দ্রুত নিজের জায়গা করে নিলেন।
তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করলেন এবং শিক্ষাদান ও লেখালেখিও চালিয়ে গেলেন।
কিন্তু কায়রো তাঁকে শুধু সম্মান দেয়নি।
এখানেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর ব্যক্তিগত আঘাতগুলোর একটি পেলেন।
ইতিহাসের বাইরে একজন মানুষ
ইবনে খালদুনকে আমরা সাধারণত ইতিহাসবিদ হিসেবে দেখি।
কিন্তু ইতিহাসের এই বিশাল নামটিরও একটি ব্যক্তিগত জীবন ছিল।
১৪০০-এর দশকের শুরুতে তিনি যখন দামেস্ক অঞ্চলে রাজনৈতিক মিশনে ছিলেন, তখন তাঁর পরিবার কায়রোতে ছিল।
সেই সময় মিসরে প্লেগের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল।
ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের অনেকেই মহামারিতে মারা গেছেন।
একজন ইতিহাসবিদের কাছে এটি হয়তো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
একজন পিতার কাছে এটি ছিল পৃথিবীর ভেঙে পড়া।
তবু ইবনে খালদুন লিখতে থাকলেন।
কাজ করতে থাকলেন।
কারণ তাঁর কাছে জ্ঞান ছিল কেবল পেশা নয়।
এটি ছিল মানুষের অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।
তৈমুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ
১৪০১ সাল।
দামেস্ক অবরোধ করেছে তৈমুরের বাহিনী।
মধ্য এশিয়া থেকে উঠে আসা এই বিজেতা তখন সমগ্র অঞ্চলের জন্য এক ভয়ংকর সামরিক শক্তি।
মামলুক শাসকেরা পরিস্থিতি সামলাতে ইবনে খালদুনকে কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে পাঠালেন।
দামেস্কের বাইরে তৈমুরের শিবিরে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়।
একদিকে বিজেতা।
অন্যদিকে ইতিহাসের একজন বিশ্লেষক।
তৈমুর ছিলেন সামরিক শক্তির প্রতীক।
ইবনে খালদুন ছিলেন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের প্রতিনিধি।
এই সাক্ষাৎ শুধু কূটনৈতিক ছিল না।
এটি ছিল দুই ধরনের ক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া।
তৈমুর জানতে চেয়েছিলেন উত্তর আফ্রিকা ও মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে।
ইবনে খালদুন তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন।
দামেস্কের মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি কথা বলেন।
এই সাক্ষাৎ তাঁর আত্মজীবনীতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এবং এখানেও তাঁর স্বভাবটি স্পষ্ট:
ক্ষমতাবান মানুষের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি কেবল প্রশংসা করার মানুষ ছিলেন না।
তিনি ছিলেন একজন পর্যবেক্ষক।
হজের পথে
জীবনের শেষ পর্যায়ে ইবনে খালদুন হজ পালন করেন।
মক্কার পথে যাত্রা তাঁর জীবনের রাজনৈতিক ভ্রমণগুলোর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
এবার কোনো সুলতানের দরবারে যাওয়ার জন্য নয়।
কোনো কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করার জন্য নয়।
কোনো রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করার জন্যও নয়।
একজন মানুষ হিসেবে নিজের রবের ঘরের দিকে যাত্রা।
রাজা, সুলতান, মন্ত্রী, সেনাপতি, রাজনীতি, সম্পদ, ক্ষমতা—এসবের ওপরে যে আরেকটি বাস্তবতা আছে, তাঁর দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো তাঁকে সেটি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল।
তিনি সারা জীবন দেখেছিলেন মানুষের তৈরি ক্ষমতার উত্থান-পতন।
কিন্তু হজের পথে তিনি এমন এক কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গেলেন, যা কোনো রাজবংশের হাতে নির্মিত নয়।
শেষ জীবন
ইবনে খালদুনের জীবন শেষ হয় ১৪০৬ সালে, কায়রোতে।
তখন তাঁর বয়স প্রায় ৭৪।
তিনি জীবনে বহুবার পদ হারিয়েছেন।
বন্দি হয়েছেন।
নির্বাসিত হয়েছেন।
রাজদরবারে সম্মান পেয়েছেন।
আবার সেই দরবার থেকেই দূরে সরে গেছেন।
বন্ধুত্ব করেছেন।
শত্রুতার মুখোমুখি হয়েছেন।
নিজের পরিবার হারিয়েছেন।
তবু শেষ পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো সুলতানের উপদেষ্টা হিসেবে রয়ে যায়নি।
রয়ে গেছে তাঁর কলম।
সাত শতাব্দী পর
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পরও ইবনে খালদুনের চিন্তা দীর্ঘদিন বিশ্বজুড়ে সেই মর্যাদা পায়নি, যা আজ আমরা তাকে দিই।
উনিশ শতকে ইউরোপীয় পণ্ডিতরা আরবি পাণ্ডুলিপি ও অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর কাজ নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেন।
তারপর ধীরে ধীরে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতির গবেষণায় তাঁর নাম ফিরে আসে।
মানুষ অবাক হয়ে দেখতে শুরু করল:
একজন উত্তর আফ্রিকান মুসলিম পণ্ডিত ছয় শতাব্দী আগে এমন কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, যেগুলো আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা অনেক পরে পদ্ধতিগতভাবে আলোচনা করেছেন।
রাষ্ট্রের জীবনচক্র।
সামাজিক সংহতি।
অর্থনৈতিক প্রণোদনা।
করনীতি।
শ্রম।
শহর ও গ্রাম।
ক্ষমতার পরিবর্তন।
সভ্যতার উত্থান ও পতন।
তবে ইবনে খালদুনকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের কোনো একজন প্রতিষ্ঠাতার সরল পূর্বসূরি বানিয়ে ফেললেও তাঁর চিন্তার নিজস্বতা হারিয়ে যায়।
কারণ তিনি ছিলেন তাঁর নিজের সময়ের সন্তান।
তাঁর চিন্তার মধ্যে ছিল ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব, ইতিহাস, ফিকহ, দর্শন এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয়।
ইকবালের চোখে ইবনে খালদুন
আল্লামা ইকবাল ইবনে খালদুনের চিন্তার মধ্যে কুরআনিক ইতিহাসচেতনার গভীর প্রভাব দেখতে পেয়েছিলেন।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ।
কারণ ইবনে খালদুনের কাছে ইতিহাস ছিল কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়।
কুরআনও মানুষকে অতীত জাতির পরিণতি নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করে।
কেন কোনো জাতি উঠে দাঁড়ায়?
কেন তারা শক্তিশালী হয়?
কেন তারা নিজেদের সীমা অতিক্রম করে?
কেন শেষ পর্যন্ত তাদের পতন ঘটে?
ইবনে খালদুন এই প্রশ্নগুলোকে একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
তাঁর কাছে ইতিহাসের পেছনে ছিল নিয়ম, কারণ এবং মানবসমাজের আচরণ।
এই জায়গাতেই তাঁর চিন্তা আজও আকর্ষণীয়।
সমাধির চিহ্ন মুছে গেছে, চিন্তার চিহ্ন নয়
কায়রোর মাটিতে ইবনে খালদুনের সমাধির চিহ্ন আজ আর আগের মতো স্পষ্ট নয়।
সময়ের স্বাভাবিক নিয়মেই মুছে গেছে অনেক কিছু।
কিন্তু একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়ে গেছে।
কবরের চিহ্ন মুছে গেছে, কিন্তু তাঁর চিন্তার চিহ্ন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আজ যখন কোনো সমাজবিজ্ঞানী রাষ্ট্রের ভেতরের সংহতি নিয়ে আলোচনা করেন, যখন অর্থনীতিবিদ কর ও উৎপাদনের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন, যখন ইতিহাসবিদ প্রশ্ন করেন কোনো সভ্যতার পতনের প্রকৃত কারণ কী, তখন ইবনে খালদুনের ছায়া কোথাও না কোথাও ফিরে আসে।
তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, ইতিহাস মানে শুধু কী ঘটেছিল তা জানা নয়।
ইতিহাস মানে প্রশ্ন করা:
কেন ঘটেছিল?
আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন:
যে কারণে একবার ঘটেছিল, সেই কারণ কি আবারও কোনো সমাজকে একই পথে নিয়ে যেতে পারে?
তাই ইবনে খালদুন কেবল অতীতের একজন ইতিহাসবিদ নন।
তিনি এমন একজন পর্যবেক্ষক, যিনি অতীতের আয়না হাতে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের মানুষকে নিজের সমাজের মুখ দেখতে শিখিয়েছেন।
রাজদরবার তাঁকে পদ দিয়েছিল।
কারাগার তাঁকে অভিজ্ঞতা দিয়েছিল।
নির্বাসন তাঁকে পৃথিবী দেখিয়েছিল।
নিঃসঙ্গতা তাঁকে মুকাদ্দিমা দিয়েছিল।
আর ইতিহাস তাঁকে দিয়েছে এমন এক স্থান, যেখান থেকে সাত শতাব্দী পরও তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেন।
আমি ইবনে খালদুন।
এই পরিচয়ের জন্য তাঁর আর কোনো উপাধির প্রয়োজন হয় না।

Comments
Post a Comment