কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুরু হয় এমন কিছু মানুষের হাত ধরে, যারা নিজেরাই জানে না যে তারা ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে।
তারা হয়তো কোনো সাম্রাজ্য গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে রাস্তায় নামে না। তাদের হাতে থাকে না কোনো বিশাল সেনাবাহিনী। থাকে শুধু কিছু প্রশ্ন, কিছু ক্ষোভ, আর একটি ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা।
আরব বিশ্বের এক সময় এমনই একটি প্রজন্ম জেগে উঠেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে আরব দেশগুলোর বড় একটি অংশ এমন শাসকদের অধীনে ছিল, যারা বছরের পর বছর, কখনো দশকের পর দশক ক্ষমতায় থেকেছেন। ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, সামরিক অভ্যুত্থান, বিদেশি শক্তির প্রভাব এবং স্বৈরশাসনের দীর্ঘ ছায়া মানুষের রাজনৈতিক কল্পনাকে সংকুচিত করে দিয়েছিল।
কিন্তু যারা নতুন শতাব্দীতে বড় হচ্ছিল, তারা আগের প্রজন্মের মতো পৃথিবীকে দেখেনি।
তারা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে জন্মায়নি। তারা ইন্টারনেটের পৃথিবীতে বড় হয়েছে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করছে, কীভাবে সরকারকে প্রশ্ন করছে, কীভাবে নিজেদের অধিকার দাবি করছে, তা তারা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল।
তারপর একদিন সেই অদৃশ্য পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠল।
তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আগুন ছড়িয়ে পড়ল এক দেশ থেকে আরেক দেশে।
মানুষ রাস্তায় নামল।
পুরোনো শাসকদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠল।
কেউ পতন দেখল, কেউ অস্থিরতা দেখল, কেউ আশার আলো দেখল।
কিন্তু এই ঘটনাকে শুধু রাজনৈতিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে এর একটি গভীর দিক চোখ এড়িয়ে যায়।
এটি ছিল প্রজন্মের পরিবর্তনের গল্পও।
এই জায়গায় ইতিহাস আমাদের বহু শতাব্দী পেছনে নিয়ে যায়।
মূসা আলাইহিস সালামের সময় বনী ইসরাইলও এক ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যে বাস করছিল। ফেরাউনের শাসন শুধু তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়নি, দীর্ঘ দাসত্ব তাদের মানসিকতাকেও প্রভাবিত করেছিল।
আল্লাহ তাদের মুক্তি দিলেন।
কিন্তু মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা স্বাধীন জাতি হয়ে উঠতে পারেনি।
দাসত্বের অভ্যাস মানুষের শরীরের চেয়ে মনে বেশি সময় বেঁচে থাকে।
তাই তাদের সামনে শুধু একটি নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছানোর প্রশ্ন ছিল না। প্রয়োজন ছিল এমন একটি প্রজন্মের, যারা দাসত্বের মানসিকতা পেছনে ফেলে নতুন সমাজ গড়তে পারবে।
মরুভূমির সেই দীর্ঘ সময় তাই শুধু ভৌগোলিক যাত্রা ছিল না।
সেটি ছিল একটি প্রজন্মের পরিবর্তনের সময়।
পুরোনো প্রজন্ম চলে গেল। নতুন প্রজন্ম উঠে এল। আর সেই নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে এলেন ইউশা ইবন নূন।
ইতিহাস যেন তখন একটি গভীর সত্য আমাদের সামনে রেখে গেল:
কখনো কখনো একটি সমাজকে বদলাতে শুধু শাসনব্যবস্থা বদলানো যথেষ্ট নয়। বদলাতে হয় সেই সমাজের নেতৃত্বের মানুষকেও।
আরব বসন্তের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে এই কথাটি আবার মনে পড়ে।
তবে একটি বিপ্লব শুরু করা আর একটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে নির্মাণ করা এক জিনিস নয়।
তিউনিসিয়ায় পরিবর্তনের পর একটি রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছিল। সেখানে রশিদ আল-গানুশির নেতৃত্বে ইসলামপন্থীরা এমন এক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেখানে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেয়ে সংবিধান ও রাজনৈতিক সমঝোতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কিন্তু মিসরের গল্প অন্যদিকে মোড় নিল।
হোসনি মোবারকের দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর মুসলিম ব্রাদারহুড রাজনৈতিক ক্ষমতায় এল। বহু মানুষের কাছে এটি ছিল বহু দশকের অপেক্ষার পর পাওয়া একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
কিন্তু ক্ষমতায় আসা আর ক্ষমতা পরিচালনা করা এক বিষয় নয়।
নতুন সরকার দ্রুত বিরোধিতার মুখে পড়ে। রাজনৈতিক ভুল, সমাজের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে দূরত্ব এবং ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপে আবার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়।
একটি বিপ্লব যে কত সহজে নিজের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য হারিয়ে ফেলতে পারে, মিসর তার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল।
লিবিয়ার ঘটনাও ছিল ভিন্ন।
সেখানে পুরোনো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি। ফলে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলো। বিভিন্ন গোষ্ঠী, আঞ্চলিক শক্তি এবং সামরিক নেতৃত্ব সেই শূন্যতা পূরণের জন্য প্রতিযোগিতায় নামল।
ইয়েমেনের সংকট আবার অন্য রকম।
সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল উপজাতীয় কাঠামো, দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং হুথি আন্দোলনের উত্থান। দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়।
আর সিরিয়া?
সিরিয়ার গল্প হয়তো সবচেয়ে বেদনাদায়ক।
বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটি একটি ভয়াবহ যুদ্ধে পরিণত হলো।
ইরান ও হিজবুল্লাহর সমর্থন একদিকে, বিভিন্ন বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী অন্যদিকে, আর এর মাঝখানে সাধারণ মানুষ।
একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট যখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেই সংকটের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বিশৃঙ্খলার ভেতরেই জায়গা তৈরি হলো আল-কায়েদা এবং পরে আইএসআইএসের মতো উগ্র সংগঠনের জন্য।
আইএসআইএস ইসলামের নাম ব্যবহার করেছিল।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়।
ইসলামের নাম ব্যবহার করলেই কি কোনো সংগঠন ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে?
উত্তর খুঁজতে হলে শুধু তাদের দাবি নয়, তাদের কাজের দিকে তাকাতে হয়।
ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে জ্ঞানচর্চা আছে, ন্যায়বিচার আছে, মানুষের মর্যাদা আছে, সভ্যতা নির্মাণ আছে। কিন্তু উগ্রতা, নির্বিচার সহিংসতা এবং মুসলমানদেরই হত্যা করার সংস্কৃতি সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়, আইএসআইএসের সমস্যা শুধু রাজনৈতিক নয়। তারা ইসলামের নাম ব্যবহার করলেও তাদের উগ্রতা মুসলিম সমাজের জন্যও একটি ভয়াবহ বিপদ তৈরি করেছে।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়।
কারণ কোনো সমাজের সব ব্যর্থতার দায় বাইরের মানুষের ওপর দিয়ে দিলে নিজের আয়নাটা আর দেখা হয় না।
আর যে জাতি নিজের আয়নায় তাকাতে ভয় পায়, সে নিজের অসুস্থতা সারাতেও পারে না।
তাই প্রশ্নটি আরও গভীরে যায়।
মুসলিম বিশ্বের দুর্বলতা আসলে কোথায়?
উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে মানুষের আচরণ।
একটি সভ্যতা কেবল তার বড় বড় মসজিদ, প্রাসাদ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচিত হয় না।
তার পরিচয় পাওয়া যায় একজন সাধারণ মানুষের আচরণে।
সে ঘরে পরিবারের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে।
সে রাস্তায় অন্যের অধিকার কতটা সম্মান করে।
সে অফিসে নিজের দায়িত্ব কতটা পালন করে।
সে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরও কি ইসলামের নৈতিকতা সঙ্গে নিয়ে বের হয়?
একটি ছোট উদাহরণও অনেক কিছু বলে দিতে পারে।
মানুষ মসজিদে নামাজ পড়ে বের হলো। কিন্তু বের হয়ে দেখল তার জুতা অন্য কারও জুতার নিচে আটকে আছে। সে কি অন্যের জুতা সরিয়ে নিজেরটা বের করে নেবে, নাকি এমনভাবে করবে যাতে অন্যের অসুবিধা হয়?
ঘটনাটি ছোট।
কিন্তু সভ্যতা তৈরি হয় এমন ছোট ছোট আচরণ দিয়েই।
ইবাদত যদি চরিত্রে পৌঁছায় না, তাহলে ইবাদতের প্রভাব কোথায়?
এরপর আসে কাজের প্রশ্ন।
একটি দেশের সরকারি কর্মচারী যদি অফিসে সময়মতো না আসে, মানুষের কাজকে গুরুত্ব না দেয়, দায়িত্বকে বোঝা মনে করে, তাহলে রাষ্ট্র কীভাবে কার্যকর হবে?
অন্যদিকে আরামকোর মতো একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিশ্বমানের দক্ষতা তৈরি করতে পেরেছে?
পার্থক্য শুধু সম্পদে নয়।
পার্থক্য কাজের সংস্কৃতিতে।
একজন মানুষ নিজের দায়িত্বকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে, তার ওপরও একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।
তারপর আসে উৎপাদনশীলতা।
একটি জাতি যত মানুষ তৈরি করে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কী তৈরি করে।
তারা নতুন জ্ঞান তৈরি করছে কি?
নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে কি?
নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে কি?
নাকি শুধু অন্যের তৈরি জিনিস ব্যবহার করছে?
এখানে এসে শিক্ষার প্রশ্নটি সামনে আসে।
বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু পুরোনো জ্ঞান পড়ায় না, নতুন জ্ঞানও তৈরি করে।
গবেষণাগারে নতুন ওষুধ তৈরি হয়।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন যন্ত্র বানায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ধারণা জন্ম নেয়।
একটি সভ্যতা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে জ্ঞান গ্রহণের পাশাপাশি জ্ঞান উৎপাদন করতে পারে।
মুসলিম বিশ্বের সমস্যা হলো, বহু জায়গায় আমরা এখনও জ্ঞান উৎপাদনের চেয়ে জ্ঞান গ্রহণে বেশি অভ্যস্ত।
অথচ ইতিহাসের একটি সময় ছিল, যখন পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডারে মুসলিম বিশ্বের অবদান ছিল অসাধারণ।
কর্ডোবার দিকে তাকালেই তার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
আন্দালুসের সেই নগরী শুধু রাজনৈতিক রাজধানী ছিল না। সেটি ছিল জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক বিশাল কেন্দ্র। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানীরা সেখানে আসতেন। বই, গবেষণা, চিকিৎসা, গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, স্থাপত্য, সাহিত্য, ভাষা, সবকিছু মিলিয়ে সেখানে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য বৌদ্ধিক পরিবেশ।
শাসকেরা জ্ঞানীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতেন।
কারণ তারা জানতেন, একটি সভ্যতার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্বর্ণভাণ্ডার নয়।
তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জ্ঞানী মানুষ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই শক্তি দুর্বল হতে শুরু করল।
একটি সভ্যতা যখন প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, তখন তার পতন শুরু হয়ে যায়।
যে সমাজ নতুন জ্ঞানকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে, সে একসময় অন্যের জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
মুদ্রণযন্ত্রের ইতিহাসও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ইউরোপে মুদ্রণ প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও মুসলিম বিশ্বের কিছু অংশে এটি গ্রহণ করতে দীর্ঘদিন অনীহা ছিল। ধর্মীয় ও সামাজিক নানা আশঙ্কা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।
ফলে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন মুসলিম বিশ্বে যথেষ্ট দ্রুত জায়গা করে নিতে পারেনি।
ইতিহাসের এই ছোট ছোট সিদ্ধান্ত কখনো কখনো শতাব্দী পরে গিয়ে বড় ফল তৈরি করে।
অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসেও আমরা এমন একটি পরিবর্তন দেখি।
একসময় অটোমানরা ছিল পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য। তাদের সেনাবাহিনী ইউরোপের হৃদয়ের দিকে অগ্রসর হয়েছিল।
ভিয়েনার দিকে তাদের অভিযান ইউরোপকে আতঙ্কিত করেছিল।
কিন্তু সাম্রাজ্য শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে টিকে থাকে না।
সামরিক শক্তি যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয় না, তখন একসময় শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়।
ভিয়েনার পরবর্তী সময়কে তাই অটোমান শক্তির দীর্ঘ অবক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।
একসময় যারা অন্যদের কাছ থেকে শিক্ষা দিত, তারাই অন্যদের প্রযুক্তি ও জ্ঞান অনুসরণ করতে বাধ্য হতে শুরু করল।
এভাবেই সভ্যতার পতন আসে।
একদিনে নয়।
ধীরে ধীরে।
প্রথমে চিন্তায়।
তারপর শিক্ষায়।
তারপর প্রতিষ্ঠানে।
তারপর অর্থনীতিতে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শক্তিতেও তার প্রভাব পড়ে।
কিন্তু পতনের গল্পের আরেকটি অধ্যায়ও আছে।
জাগরণের অধ্যায়।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গভীর আঘাত হয়ে এসেছিল। পরাজয় শুধু সামরিক ছিল না; এটি বহু মানুষের আত্মবিশ্বাসের ওপরও আঘাত করেছিল।
কিন্তু কখনো কখনো পরাজয় মানুষকে এমন প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, যা বিজয়ের সময় সে করে না।
আমরা কোথায় ভুল করেছি?
কেন আমরা পিছিয়ে পড়েছি?
কেন অন্যরা এগিয়ে যাচ্ছে?
আমরা কী হারিয়েছি?
এই প্রশ্নগুলো থেকেই নতুন চিন্তার জন্ম হতে পারে।
আর নতুন প্রজন্ম আবার এগিয়ে এল।
ফেসবুক, টুইটার এবং নতুন যোগাযোগমাধ্যম তাদের হাতে এমন একটি শক্তি দিল, যা আগের প্রজন্মের ছিল না।
একজন তরুণ তার ঘরে বসে নিজের কথা হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছিল।
একটি ভিডিও, একটি ছবি, একটি পোস্ট মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারছিল।
কিন্তু প্রযুক্তি শুধু কণ্ঠকে শক্তিশালী করে।
চিন্তা না থাকলে প্রযুক্তি কোনো জাতিকে উদ্ধার করতে পারে না।
সুতরাং প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে।
আমাদের কী বদলাতে হবে?
শুধু সরকার?
শুধু নির্বাচন?
শুধু অর্থনীতি?
না।
পরিবর্তনের অনেক স্তর আছে।
প্রথম স্তর মানুষের আচরণ।
দ্বিতীয়টি তার কার্যকারিতা ও উৎপাদনশীলতা।
তৃতীয়টি জ্ঞান ও শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া।
চতুর্থটি আদর্শ ও চিন্তার সংকট।
আর পঞ্চমটি নেতৃত্ব।
এই পাঁচটি পরস্পরের সঙ্গে জড়িত।
একজন মানুষ যদি ভুলভাবে জীবনকে বোঝে, তার আচরণেও সেই ভুলের ছাপ পড়বে।
আচরণ যদি দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হবে।
প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাষ্ট্র দুর্বল হবে।
আর দুর্বল রাষ্ট্রের নেতৃত্বও শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়বে।
তাই আচরণ বদলাতে হলে চিন্তা বদলাতে হবে।
কিন্তু চিন্তা বদলানো মানে শুধু নতুন কিছু মুখস্থ করা নয়।
মানুষকে বুঝতে হবে কোনটি মূলনীতি, আর কোনটি কৌশল।
কোনটি অপরিবর্তনীয় মূল্যবোধ, আর কোনটি সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
সব মতপার্থক্যকে শরিয়তের প্রশ্ন বানিয়ে ফেললে চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
একজন মানুষ আমার সঙ্গে একমত নয় বলে সে ইসলামবিরোধী হয়ে যাবে না।
একটি দল আমার দল নয় বলে সেটি শত্রু হয়ে যাবে না।
কেউ আমার পদ্ধতি অনুসরণ করছে না বলে সে খারাপ মুসলিম হয়ে যাবে না।
ইসলামের ইতিহাসে মতভেদ ছিল।
ইমাম শাফেয়ি ও অন্যান্য বড় আলেমদের ঐতিহ্যে আমরা দেখি, বৈধ মতপার্থক্যকে সবসময় শত্রুতায় পরিণত করা হয়নি।
কারণ তারা জানতেন, সত্যের অনুসন্ধান ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে বড়।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে সব মত সমানভাবে সত্য।
ভুলকে ভুল বলতে হবে।
তবে মানুষকে সংশোধন করার একটি পদ্ধতি থাকতে হবে।
একজন মানুষ ভুল করলেই তাকে শেষ করে দেওয়া হলে নতুন কিছু করার সাহস আর কেউ পাবে না।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের জীবনের ঘটনাগুলো এ ক্ষেত্রে একটি শিক্ষা দেয়।
তিনি ছিলেন অসাধারণ সামরিক নেতা। তবু তার জীবনেও এমন সিদ্ধান্ত এসেছে, যেখানে তার কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কিন্তু একটি ভুলের প্রতিক্রিয়া এমন ছিল না যে তার সমস্ত যোগ্যতা মুছে ফেলা হবে।
এটাই নেতৃত্বের সৌন্দর্য।
মানুষকে দায়িত্ব দিতে হয়।
দায়িত্ব দিলে ভুলের সম্ভাবনাও থাকে।
কিন্তু ভুলের ভয় যদি উদ্যোগকে হত্যা করে, তাহলে একটি সমাজ কখনো নতুন কিছু তৈরি করতে পারবে না।
এই জায়গায় এসে নেতৃত্বের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন ভালো নেতা কাকে বলে?
বয়স্ক মানুষকে?
সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী মানুষকে?
সবচেয়ে ধার্মিক মানুষকে?
সবচেয়ে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানে থাকা মানুষকে?
নাকি এমন কাউকে, যার ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা আছে?
ইসলামের প্রথম যুগে নেতৃত্বের বহু উদাহরণ এই ধারণাকে ভেঙে দেয়।
উসামা ইবন যায়েদ তখন তরুণ। কিন্তু তাকে এমন একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে তার চেয়ে বয়সে ও অভিজ্ঞতায় বড় মানুষ ছিলেন।
কারণ নেতৃত্বের জন্য বয়সই সব নয়।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বের দিকে তাকালেও বোঝা যায়, নেতৃত্ব মানে শুধু বক্তৃতা দেওয়া নয়। কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, মানুষের ভয়কে অতিক্রম করা এবং নীতির জায়গায় দৃঢ় থাকা নেতৃত্বের অংশ।
একজন নেতা ভালো মানুষ হতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তাহলে তার ভালোত্ব একা তাকে কার্যকর নেতা বানাবে না।
কেউ জ্ঞানী হতে পারেন, কিন্তু মানুষকে সংগঠিত করতে না পারলে সেই জ্ঞান নেতৃত্বে পরিণত হবে না।
কেউ অত্যন্ত ধার্মিক হতে পারেন, কিন্তু যদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে না পারেন, তাহলেও একটি প্রতিষ্ঠান তার হাতে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
অতএব নেতৃত্বের সঙ্গে চরিত্র যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষতা।
আর দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োজন দৃষ্টি।
এই জায়গায় নারী নেতৃত্ব নিয়েও মুসলিম সমাজে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে।
একটি প্রসিদ্ধ হাদিসকে কেন্দ্র করে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কেউ এটিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যাপারে সাধারণ নীতি হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু বিতর্কের বাইরে একটি বিষয় পরিষ্কার।
একটি সমাজ তার মানুষের অর্ধেক সম্ভাবনাকে অগ্রাহ্য করে শক্তিশালী হতে পারে না।
নারী হোক বা পুরুষ, নেতৃত্বের প্রশ্নে যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ, বিচক্ষণতা, পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সভ্যতা কোনো এক শ্রেণির মানুষের একক সৃষ্টি নয়।
এটি একটি সমষ্টিগত নির্মাণ।
কিন্তু নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অজুহাত।
“সময় খারাপ।”
“মানুষ সহযোগিতা করছে না।”
“অর্থ নেই।”
“পরিস্থিতি অনুকূলে নয়।”
ইতিহাসে বড় কাজগুলো প্রায় কখনোই নিখুঁত পরিস্থিতিতে হয়নি।
যারা পরিবর্তন এনেছেন, তাদেরও সীমাবদ্ধতা ছিল।
তাদেরও অর্থের অভাব ছিল।
তাদেরও শত্রু ছিল।
তাদেরও ব্যর্থতা ছিল।
তবু তারা কাজ করেছেন।
কারণ তারা পরিস্থিতিকে অজুহাত না বানিয়ে বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
একজন নেতা তাই শুধু প্রশ্ন করেন না, “আমাদের কী নেই?”
তিনি প্রশ্ন করেন,
“আমাদের যা আছে, তা দিয়ে আমরা কী করতে পারি?”
এই একটি প্রশ্নই কখনো কখনো একটি জাতির ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
কারণ নেতৃত্ব আসলে ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতা।
আর সেই ভবিষ্যৎ কেবল নিজের জন্য নয়, একটি সমাজের জন্য।
এখানে আবার হুদাইবিয়ার কথা মনে পড়ে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন, সব বিজয় সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না।
কখনো আজকের আপাত ছাড় আগামী দিনের বড় বিজয়ের পথ খুলে দেয়।
তাই একজন দূরদর্শী নেতা শুধু আজকের জনপ্রিয়তা দেখেন না।
তিনি দশ বছর পর কী হবে, সেটিও ভাবেন।
এই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা আজকের মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা অনেক সময় দ্রুত ফল চাই।
আজ পরিবর্তন।
আজ সাফল্য।
আজ রাজনৈতিক বিজয়।
কিন্তু একটি সভ্যতা একদিনে তৈরি হয় না।
কর্ডোবার বিশ্ববিদ্যালয়, বাগদাদের জ্ঞানচর্চা, মুসলিম বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, স্থাপত্য, সাহিত্য, এগুলো একদিনে তৈরি হয়নি।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজ করেছে।
একজন বীজ বপন করেছে।
আরেকজন গাছ বড় করেছে।
তৃতীয়জন তার ছায়ায় বসেছে।
আজ আমরা যদি শুধু নিজেদের সুবিধার কথা ভাবি, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাব?
এই প্রশ্নটি খুব সহজ।
কিন্তু এর উত্তর কঠিন।
কারণ ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য বর্তমানকে ত্যাগ করতে হয়।
একজন শিক্ষক হয়তো জানেন, তার ছাত্রের পরিবর্তনের ফল তিনি নিজে দেখতে পাবেন না।
একজন গবেষক হয়তো জানেন, তার কাজের ফল দশ বছর পরে আসবে।
একজন বাবা হয়তো জানেন, সন্তান বড় হওয়ার আগে তাকে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
তবু তারা কাজ করেন।
কারণ তারা ভবিষ্যতে বিশ্বাস করেন।
একটি সভ্যতারও ঠিক এমন বিশ্বাস প্রয়োজন।
আর সেই বিশ্বাসের নাম আশা।
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতা যত কঠিনই হোক, ইতিহাস বলে পতন চিরস্থায়ী নয়।
ইতিহাসের প্রতিটি দীর্ঘ রাতের পর কোনো না কোনো সময় ভোর এসেছে।
কিন্তু ভোরের অপেক্ষা করলেই ভোর আসে না।
মানুষকে উঠে দাঁড়াতে হয়।
কাজ করতে হয়।
নিজেকে বদলাতে হয়।
জ্ঞান অর্জন করতে হয়।
প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হয়।
ভুল স্বীকার করতে হয়।
নেতৃত্বকে নতুনভাবে বুঝতে হয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিজের দায়িত্বকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া যাবে না।
তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়।
আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
কারণ আল্লাহ মানুষকে পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ আকাশ থেকে নেমে আসবে না।
মানুষের হাত দিয়েই তা তৈরি হবে।
একজন তরুণের হাতে।
একজন শিক্ষকের হাতে।
একজন গবেষকের হাতে।
একজন মায়ের হাতে।
একজন বাবার হাতে।
একজন সৎ ব্যবসায়ীর হাতে।
একজন দক্ষ প্রশাসকের হাতে।
একজন দূরদর্শী নেতার হাতে।
আর এমন অসংখ্য মানুষের হাতে, যাদের নাম হয়তো কোনো ইতিহাসের বইয়ে লেখা থাকবে না।
কিন্তু তাদের ছোট ছোট কাজগুলো একদিন বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করবে।
তাই মুসলিম বিশ্বের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এটি নয় যে, কে ক্ষমতায় আছে।
প্রশ্নটি হলো, আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি?
কারণ আজকের মানুষই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে।
আজকের ছাত্রই আগামী দিনের গবেষক হবে।
আজকের তরুণই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
আজকের পরিবারই আগামী দিনের সমাজ তৈরি করবে।
আর আজকের চিন্তাই আগামী দিনের সভ্যতার রূপ নির্ধারণ করবে।
ইতিহাস তাই শুধু অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকার নাম নয়।
ইতিহাস একটি আয়না।
সেখানে আমরা মূসা আলাইহিস সালামের সময়ের প্রজন্ম পরিবর্তন দেখি।
আরব বিশ্বের দীর্ঘ স্বৈরশাসন দেখি।
আরব বসন্তের আকস্মিক জাগরণ দেখি।
তিউনিসিয়ার সমঝোতার চেষ্টা দেখি।
মিসরের ব্যর্থতা ও সামরিক প্রত্যাবর্তন দেখি।
লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় শূন্যতা দেখি।
ইয়েমেনের জটিলতা দেখি।
ইরাকের ভাঙন দেখি।
সিরিয়ার দীর্ঘ যুদ্ধ দেখি।
আইএসআইএসের উগ্রতার উত্থান দেখি।
তারপর আবার কর্ডোবার জ্ঞানচর্চা দেখি।
অটোমান শক্তির উত্থান দেখি।
ভিয়েনার দরজায় পৌঁছানো সেনাবাহিনী দেখি।
তারপর ধীরে ধীরে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার পতন দেখি।
১৯৬৭-এর পর নতুন প্রশ্নের জন্ম দেখি।
আর আজকের তরুণদের হাতে নতুন প্রযুক্তি দেখি।
এই পুরো ইতিহাস যেন আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়।
কোন জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি?
আমরা কি আবার শুধু অতীতের গল্প বলব?
বলব, একসময় আমরা কী ছিলাম?
নাকি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার কিছু তৈরি করব?
কারণ একটি সভ্যতার পুনর্জাগরণ কখনো অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়।
অতীতের শক্তিগুলো বুঝে নতুন সময়ের জন্য নতুন কিছু তৈরি করাই আসল কাজ।
ইসলামী সভ্যতার ভবিষ্যৎ তাই অতীতের অনুকরণে নয়।
তার ভবিষ্যৎ নিহিত আছে তার মূল মূল্যবোধকে ধারণ করে নতুন পৃথিবী নির্মাণে।
সত্যের প্রতি আনুগত্য।
জ্ঞান অনুসন্ধান।
মানুষের মর্যাদা।
ন্যায়বিচার।
দায়িত্ববোধ।
শৃঙ্খলা।
উৎকর্ষ।
আর এমন নেতৃত্ব, যে ক্ষমতাকে নিজের সম্পদ নয়, মানুষের আমানত হিসেবে দেখে।
হয়তো পরিবর্তন শুরু হবে কোনো বিশাল রাজনৈতিক ঘোষণায় নয়।
হয়তো শুরু হবে একটি ছোট সিদ্ধান্তে।
একজন মানুষ নিজের কাজ ঠিকভাবে করবে।
একজন ছাত্র সত্যিকারভাবে পড়বে।
একজন শিক্ষক শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, চিন্তা করার জন্য শেখাবেন।
একজন গবেষক নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করবেন।
একজন নেতা নিজের ভুল স্বীকার করবেন।
একজন মুসলিম অন্যের সঙ্গে মতভেদ করেও তাকে সম্মান করতে শিখবেন।
আর হাজার, লাখ, কোটি মানুষের এমন ছোট ছোট পরিবর্তন একদিন একটি বড় পরিবর্তনে পরিণত হবে।
তখন ইতিহাস আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
কারণ ইতিহাস কখনো কেবল রাজাদের হাতে লেখা হয় না।
ইতিহাস লেখা হয় মানুষের হাতে।
একটি প্রজন্মের হাতে।
আর সেই প্রজন্ম যখন নিজের দুর্বলতা চিনতে শেখে, নিজের অতীত থেকে শিক্ষা নেয়, নিজের বর্তমানকে বদলাতে সাহস করে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখনই একটি জাতির জাগরণ সত্যিকার অর্থে শুরু হয়।
সম্ভবত সেই কারণেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো না,
“আমাদের কে বাঁচাবে?”
বরং—
“আমরা নিজেরা কবে জেগে উঠব?”
কারণ হয়তো ভবিষ্যতের সেই নতুন সভ্যতা এখনও জন্ম নেয়নি।
কিন্তু তার প্রথম স্পন্দন শুরু হয়ে গেছে মানুষের চিন্তায়।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো সবসময় সেখান থেকেই শুরু হয়।


Comments
Post a Comment