Skip to main content

মওদূদী বনাম দেওবন্দ : আদর্শিক সংঘাত


দিল্লি, জানুয়ারি ১৯২৭।

জুমার দিন। দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদে মানুষের ঢল নেমেছে। নামাজিদের সারি পেরিয়ে মসজিদের ভেতর-বাইরে জমে উঠেছে এক বিশাল জনসমাবেশ। মিম্বারে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন বক্তা, যার কণ্ঠে তখনকার উপমহাদেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষোভ এবং উদ্বেগ যেন একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হতো।

তিনি মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর।

তাঁর বক্তৃতা শুনতে শুনতে মানুষ অপেক্ষা করছিল, উত্তপ্ত হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের এই সময়ে তিনি মুসলমানদের জন্য কী পথনির্দেশ দেন।

কিন্তু সেদিন তিনি এমন একটি কথা বললেন, যা হয়তো উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের কাছে একটি সাধারণ আহ্বান হিসেবেই কানে পৌঁছেছিল। অথচ সেই ভিড়ের মধ্যেই একজন তরুণ সাংবাদিকের জীবনের গতিপথ বদলে গেল।

জওহর বললেন, এমন কেউ কি আছেন, যিনি ইসলামে জিহাদের প্রকৃত ধারণা নিয়ে এমন একটি বই লিখবেন, যেখানে ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলোর জবাব দেওয়া হবে এবং পৃথিবীর সামনে জিহাদের প্রকৃত রূপ স্পষ্ট করে দেওয়া হবে?

হাজারো মানুষ শুনেছিল কথাটি।

কিন্তু একজন তরুণ নিজের ভেতরেই প্রশ্ন করলেন,

“সেই মানুষটি আমি নই কেন?”

তরুণটির বয়স তখন মাত্র চব্বিশ। তিনি ছিলেন আল-জামিয়া পত্রিকার সম্পাদক। নাম, সাইয়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী।

সেদিনের সেই প্রশ্নই হয়তো তাঁর পরবর্তী বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অন্যতম সূচনা মুহূর্ত।


একটি অস্থির সময়ের সন্তান

মওদূদীর এই সিদ্ধান্তকে বোঝার জন্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকালে পুরো ছবিটা পাওয়া যায় না। সময়টিও ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।

১৯২০-এর দশকের ভারত। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ক্রমেই টানাপোড়েনের দিকে এগোচ্ছে। শুদ্ধি আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলমানদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। ইসলামের নবী ও অন্যান্য পবিত্র ব্যক্তিত্বকে নিয়েও প্রকাশ্য বিতর্ক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেখা যাচ্ছে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই ১৯২৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর শুদ্ধি আন্দোলনের অন্যতম নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ নিহত হন।

হত্যাকাণ্ডটি ছিল একজন ব্যক্তির অপরাধ। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া দ্রুত একটি বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক বিতর্কে পরিণত হয়। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক মহলে এমন বক্তব্য সামনে আসে যে ঘটনাটির দায় কেবল হত্যাকারীর নয়, বরং ইসলাম ও মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার ওপরও বর্তায়।

এমন পরিবেশেই জিহাদ নিয়ে মওদূদীর গবেষণা শুরু হয়।

তাঁর লক্ষ্য ছিল, তাঁর নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকে, ইসলামে জিহাদের ধারণাকে ব্যাখ্যা করা এবং সেটিকে সমকালীন সমালোচনার সামনে হাজির করা।

তিনি আল-জামিয়া-তে জিহাদ নিয়ে ধারাবাহিক প্রবন্ধ লেখা শুরু করলেন। একের পর এক সংখ্যা প্রকাশিত হতে লাগল। প্রায় দুই ডজনের বেশি প্রবন্ধ প্রকাশের পর সাময়িকভাবে সেই ধারাবাহিকতা থেমে যায়।

কিন্তু গবেষণা থামেনি।

লেখাটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থে পরিণত হলো।


আল-জিহাদ ফিল ইসলাম

১৯২৮ সালের জুনে মওদূদী আল-জামিয়া-র সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নীতির মধ্যে তখন মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।

এরই মধ্যে তিনি তাঁর গবেষণার কাজ শেষ করে আল-জিহাদ ফিল ইসলাম গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য পাঠান।

প্রকাশনা নানা কারণে প্রায় দুই বছর পিছিয়ে যায়। অবশেষে ১৯৩০ সালে বইটি প্রকাশিত হয়।

বইটি প্রকাশের পর যে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল, তা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সাইয়্যিদ সুলায়মান নদভী বইটির প্রশংসা করেন। দেওবন্দের বিশিষ্ট আলেম হুসাইন আহমদ মাদানীও এর বৈজ্ঞানিক ও গবেষণামূলক মূল্য স্বীকার করেন বলে ডকুমেন্টারিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি মওদূদীর সমালোচক হয়ে ওঠার বহু আগের সেই সময়ে দেওবন্দি আলেমদের একটি অংশ এই তরুণ লেখকের প্রতিভাকে স্বাগত জানিয়েছিল।

অর্থাৎ শুরুটা ছিল সংঘাত দিয়ে নয়।

বরং প্রশংসা দিয়েই।

তখনও মওদূদী এবং দেওবন্দের মধ্যকার সম্পর্ককে আজকের মতো বিরোধের চোখে দেখা সম্ভব ছিল না।

কিন্তু রাজনীতি সামনে এগোচ্ছিল।

আর রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন:

একটি জাতি আসলে কী দিয়ে গঠিত হয়?


মাদানীর ‘মুত্তাহিদা কওমিয়ত’

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে উঠে এলেন মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী।

তিনি ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের গুরুত্বপূর্ণ আলেম এবং একই সঙ্গে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা।

তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম এবং ভারতের স্বাধীনতা।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি মুত্তাহিদা কওমিয়ত, অর্থাৎ যৌথ বা সম্মিলিত জাতীয়তার ধারণা সামনে আনেন।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠী একটি রাজনৈতিক জাতি বা কওম হিসেবে একত্রিত হতে পারে, এমন ধারণাই এর কেন্দ্রে ছিল।

মাদানী এর পক্ষে মদিনার সনদের উদাহরণও সামনে আনেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মদিনার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মুসলমান ও ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে একটি চুক্তিভিত্তিক রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সেখান থেকে আধুনিক ভারতের বাস্তবতায় বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর যৌথ রাজনৈতিক কাঠামোর সম্ভাবনা দেখার চেষ্টা করা হয়।

পরবর্তীতে মাদানী তাঁর মুত্তাহিদা কওমিয়ত আওর ইসলাম গ্রন্থে এই ধারণাকে আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন।

কিন্তু মওদূদী এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলেন না।


মওদূদীর আপত্তি: জাতি, উম্মাহ ও ভূখণ্ড

মওদূদীর আপত্তির কেন্দ্র ছিল ইসলামী পরিচয়ের প্রশ্ন।

তাঁর মতে, মুসলমানদের পরিচয়কে আধুনিক ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। ইসলাম মুসলমানদের এমন একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করে, যার ভিত্তি ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শ।

তিনি তাঁর পত্রিকা তর্জুমানুল কুরআন-এ ধারাবাহিকভাবে জাতীয়তাবাদ নিয়ে লিখতে শুরু করেন। পরে এসব লেখা মাসআলা-ই কওমিয়ত নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

মওদূদী মাদানীর অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের ধারণা গ্রহণ করতে গিয়ে মুসলমানদের ইসলামী উম্মাহর স্বাতন্ত্র্য দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

আর এখান থেকেই সম্পর্কের উষ্ণতা দ্রুত কমতে শুরু করল।

একদিকে মাদানী দেখছেন ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং একটি যৌথ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজন।

অন্যদিকে মওদূদী দেখছেন মুসলমানদের স্বতন্ত্র ইসলামী পরিচয় ও উম্মাহর ধারণা।

একই বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে দুই আলেম যেন দুই ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন।


বিতর্কে এলেন ইকবাল

এই বিতর্ককে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুললেন আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল।

ইকবালের রাজনৈতিক চিন্তায়ও ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সমালোচনা ছিল প্রবল। তাঁর কবিতা ও লেখায় তিনি মুসলমানদের পরিচয়কে কেবল কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে বেঁধে দেখার বিরোধিতা করেন।

তাঁর বিখ্যাত কবিতার বিভিন্ন অংশে ‘বতন’ বা ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদের সমালোচনা প্রকাশ পেয়েছে।

সেই সময় ইকবালের কবিতা শুধু সাহিত্য ছিল না। সংবাদপত্রে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হলে তা শিক্ষিত মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় প্রভাব ফেলত।

আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যেমন একটি পোস্ট বা ভিডিও দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে যায়, তৎকালীন সময়ে সেই ভূমিকার বড় অংশ পালন করত বই, সংবাদপত্র, পত্রিকা, বক্তৃতা ও কবিতা।

তাই ইকবালের অবস্থান এই বিতর্ককে আরও বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যায়।


কিন্তু পুরো দেওবন্দ কি মাদানীর পাশে ছিল?

এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা রয়েছে।

আজকের সরল বয়ানে কখনো কখনো এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যেন মওদূদী একদিকে এবং পুরো দেওবন্দ অন্যদিকে দাঁড়িয়ে ছিল।

বাস্তবতা এত সরল ছিল না।

অধ্যাপক ও গবেষক মাওলানা শফি চিতরালীর বক্তব্য অনুযায়ী, মুত্তাহিদা কওমিয়তের প্রশ্নে দেওবন্দের সব আলেম মাদানীর অবস্থানের সঙ্গে একমত ছিলেন না।

মাওলানা শব্বীর আহমদ উসমানী এবং মুফতি মুহাম্মদ শফীসহ দেওবন্দের কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম মাদানীর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত ছিলেন না বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁদের অবস্থান বরং মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর রাজনৈতিক চিন্তার কাছাকাছি ছিল।

অর্থাৎ এখানে ‘মওদূদী বনাম পুরো দেওবন্দ’ বললে ইতিহাসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যগুলো হারিয়ে যায়।

দেওবন্দ নিজেও একটি একরৈখিক রাজনৈতিক সত্তা ছিল না।


একটি বিতর্ক, দুটি পাঠ

মদিনার সনদ এই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠেছিল।

মাদানীর ব্যাখ্যায় এটি ছিল এমন একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত, যেখানে মুসলমান ও অমুসলিম জনগোষ্ঠী একটি রাজনৈতিক চুক্তির অধীনে একসঙ্গে বসবাস ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষার কাঠামো তৈরি করেছিল।

মওদূদী এর ভিন্ন পাঠ করেন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, মদিনার রাজনৈতিক চুক্তিতে ব্যবহৃত ‘উম্মাহ’ শব্দকে আধুনিক অর্থে একটি জাতীয় রাষ্ট্রের জাতিসত্তার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কতটা যথার্থ।

অর্থাৎ বিতর্কটি শুধু রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে ছিল না।

এটি ছিল ইসলামী পরিভাষা, উম্মাহর ধারণা, রাষ্ট্র, জাতি ও রাজনৈতিক চুক্তির সম্পর্ক নিয়ে একটি ইলমি বিতর্ক।

পরবর্তীকালে এই বিতর্ক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আরও জড়িয়ে যায়।


পাকিস্তান আন্দোলনের ছায়া

১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিম লীগের প্রভাব বাড়তে থাকে। কংগ্রেসের সঙ্গে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সম্পর্ক এবং মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির বিরোধিতা মুসলিম রাজনীতির একটি বড় বিভাজন তৈরি করে।

অন্যদিকে মওদূদীর চিন্তায় মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত পরিচয়ের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ফলে কওমিয়তের বিতর্কটি কেবল একটি তাত্ত্বিক প্রশ্ন থাকল না।

এটি ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল।

একটি প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসতে লাগল:

মুসলমানরা কি একটি বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তার অংশ হয়ে থাকবে, নাকি নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে তখন মুসলিম সমাজের ভেতরেই তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছিল।


খিলাফত থেকে মুলুকিয়ত

মওদূদী ও দেওবন্দের দূরত্ব শুধু কওমিয়তের বিতর্কে থেমে থাকেনি।

পরবর্তীকালে মওদূদীর আরেকটি বহুল আলোচিত গ্রন্থ, খিলাফত ও মুলুকিয়ত, নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

গ্রন্থটিতে তিনি ইসলামী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিশ্লেষণ করেন:

কীভাবে রাশিদুন খিলাফতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে পরিবর্তিত হলো?

এখানে মওদূদী ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং তার পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু বইটির ভাষা, উপস্থাপন এবং কিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মওদূদীর মূল্যায়ন নিয়ে দেওবন্দি আলেমদের একটি অংশের তীব্র আপত্তি তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে এই বইয়ের সমালোচনায় একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মুফতি মুহাম্মদ শফী, মাওলানা ইউসুফ লুধিয়ানভী, মুফতি তাকি উসমানীসহ বিভিন্ন আলেম মওদূদীর ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করেন।

তবে সমালোচনার প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে।

প্রথমদিকে বিতর্কের কেন্দ্র ছিল বইটির বক্তব্য ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন। পরে এর ভাষা, পদ্ধতি এবং শৈলীও আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।

মওদূদীপন্থী পক্ষের যুক্তি ছিল, তাঁর বক্তব্যগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং তিনি সংশ্লিষ্ট সূত্র ও পৃষ্ঠা নম্বরও উল্লেখ করেছেন।

সমালোচকদের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রশ্ন ছিল, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও সাহাবায়ে কেরামের মতো ব্যক্তিত্বদের মূল্যায়নে কী ধরনের ভাষা ও পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য।

ফলে খিলাফত ও মুলুকিয়ত শুধু একটি বইয়ের বিতর্ক হয়ে থাকেনি।

এটি ইসলামী ইতিহাস পাঠের পদ্ধতি নিয়েও একটি বৃহত্তর আলোচনার সূত্রপাত করে।


‘মওদূদী বনাম দেওবন্দ’ কি সত্যিই এত সরল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়।

দেওবন্দ কোনো একক রাজনৈতিক মতের নাম নয়। একইভাবে মওদূদীর চিন্তাকেও শুধু পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সমীকরণ করলে তাঁর পুরো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পটি ধরা পড়ে না।

মওদূদীর চিন্তায় ইসলাম ছিল শুধু ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের বিষয় নয়; সমাজ, আইন, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সভ্যতা নিয়েও তাঁর একটি বিস্তৃত ধারণা ছিল।

অন্যদিকে দেওবন্দের আলেমদের মধ্যেও ঔপনিবেশিক বিরোধিতা, জাতীয় রাজনীতি, মুসলিম স্বাতন্ত্র্য, রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে বিভিন্ন মত ছিল।

তাই তাদের বিরোধ ছিল একই সঙ্গে ইলমি, রাজনৈতিক এবং পদ্ধতিগত।

কখনো প্রশ্ন ছিল জাতীয়তার।

কখনো রাষ্ট্রের।

কখনো ইসলামী ইতিহাসের ব্যাখ্যার।

আবার কখনো প্রশ্ন ছিল, ধর্মীয় ইতিহাসের ব্যক্তিত্বদের মূল্যায়নে একজন আলেমের ভাষা ও পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত।


ইতিহাসের বিচারক কে?

মওদূদীর সমালোচকদের একটি অভিযোগ ছিল, তাঁর লেখায় কখনো কখনো মনে হয় তিনি ইতিহাসের ব্যক্তিত্বদের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের বিচার করছেন।যেন মওদূদী বিচারকের আসনে, আর ইতিহাসের ব্যক্তিত্বরা কাঠগড়ায়।

অন্যদিকে মওদূদীপন্থী ব্যাখ্যায় বলা হয়, মওদূদীর উদ্দেশ্য ছিল কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করে ইতিহাসকে পুনরায় পাঠ করা।

এই দুই অবস্থানের মধ্যকার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ইতিহাস পড়ার দুটি ভিন্ন পদ্ধতি এখানে মুখোমুখি দাঁড়ায়ঃ

একটি পদ্ধতি ইতিহাসের ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাকে তাদের নিজস্ব সময় ও বাস্তবতার মধ্যে বোঝার ওপর জোর দেয়।

অন্যটি ধর্মীয় নৈতিক ও আদর্শিক মানদণ্ডের আলোকে ঐতিহাসিক ঘটনাকে পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়।

মওদূদীকে ঘিরে বিতর্কের একটি বড় অংশ এই দুই পদ্ধতির সংঘাত থেকেই এসেছে।


একশ বছর পরেও কেন এই বিতর্ক?

আজ মওদূদী ও মাদানীর সেই বিতর্কের প্রায় এক শতাব্দী পার হয়ে গেছে।

যে সংবাদপত্র একসময় একটি কবিতা বা একটি রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশ করে হাজারো মানুষের চিন্তার গতিপথ বদলে দিতে পারত, সেই পৃথিবী এখন আর নেই।

এখন আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

ভিডিও ক্লিপ।

ছোট পোস্ট।

দ্রুত প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু সমস্যাটিও সেখানেই।

একটি দীর্ঘ ইলমি বিতর্ক কয়েক মিনিটের ভিডিওতে পরিণত হলে তার সূক্ষ্মতা হারিয়ে যেতে পারে। একটি বই না পড়ে তার কয়েকটি উদ্ধৃতি দেখে মত তৈরি করা সহজ হয়ে যায়।

মওদূদী সম্পর্কে যেমন নানা ধরনের অতিরঞ্জিত দাবি প্রচলিত আছে, তেমনি মাদানী সম্পর্কেও একই ঘটনা ঘটে।

কেউ মওদূদীকে কয়েকটি বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন।

কেউ মাদানীকে শুধু একটি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক বানিয়ে ফেলেন।

ফলে মানুষ ব্যক্তিত্বের পূর্ণ চিন্তা পড়ার বদলে পক্ষের পরিচয় গ্রহণ করে।


বিতর্কের পরেও কিছু থেকে যায়

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মওদূদী ও মাদানীর কওমিয়ত-সংক্রান্ত রাজনৈতিক বিতর্কের মূল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়।

মাদানী পরবর্তী বাস্তবতাকে মেনে নেন। তাঁর একটি বহুল উদ্ধৃত উপমা ছিল, মসজিদ নির্মাণের আগে মসজিদ হওয়া উচিত কি না তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মসজিদ নির্মিত হয়ে গেলে সেটি আর ভেঙে ফেলার প্রশ্ন নয়।

রাজনৈতিক বিতর্কের একটি অধ্যায়ের সেখানেই সমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নগুলো থেকে যায়।

জাতি কী?

উম্মাহ কী?

রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কী?

ইসলামী ইতিহাসকে কীভাবে পড়তে হবে?

খিলাফত ও রাজতন্ত্রের পার্থক্য কী?

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার সম্পর্ক কোথায়?

এসব প্রশ্নের কোনো একটিও ১৯৪৭ সালের সঙ্গে হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।

বরং নতুন বাস্তবতায় এগুলো নতুন রূপ নিয়েছে।


শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আমাদেরই

মওদূদী ও মাদানী দুজনই এখন ইতিহাসের চরিত্র।

তাঁদের সময় চলে গেছে।

তাঁদের রাজনৈতিক বিতর্কের মূল প্রেক্ষাপটও বদলে গেছে।

কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো এখনো বেঁচে আছে।

সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান পাঠ এখানেই।

একটি পুরোনো বিতর্ককে বারবার পুনরাবৃত্তি করে নিজেদের পক্ষের মানুষ খুঁজে বের করা ইতিহাস পাঠের শেষ উদ্দেশ্য হতে পারে না।

বরং একশ বছর আগের সেই আলেমদের মতোই আমাদের নিজেদের সময়ের বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে।

তখন প্রশ্ন ছিল ব্রিটিশ ভারত, জাতীয়তা, মুসলিম পরিচয় ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।

আজকের প্রশ্ন অন্যরকম।

প্রযুক্তি বদলে গেছে। অর্থনীতি বদলে গেছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে গেছে। জ্ঞান উৎপাদনের পদ্ধতি বদলে গেছে। নতুন প্রজন্মের সামনে এসেছে সম্পূর্ণ নতুন সামাজিক ও সভ্যতাগত চ্যালেঞ্জ।

তাই মওদূদী ও মাদানীর বিতর্ককে কেবল ‘কে ঠিক ছিলেন’ এই প্রশ্নে আটকে রাখলে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হয়তো হারিয়ে যাবে।

তাঁরা দুজনই তাঁদের সময়ের একটি বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন।

আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো নিজেদের সময়ের বড় প্রশ্নগুলো খুঁজে বের করা।

কারণ ইতিহাসের পুরোনো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের নিয়ে বিতর্ক করতে করতে যদি ভবিষ্যতের পথটাই হারিয়ে যায়, তাহলে একশ বছর পরও আমরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব।

ইতিহাস তখন শুধু স্মৃতি হবে।

পথনির্দেশ নয়।

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

ইবনে খালদুন: রাজদরবার থেকে সভ্যতার অন্তর্গত সূত্রের সন্ধানে

ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল একটি যুগের প্রতিনিধি নন। তাঁরা তাঁদের সময়কে পেরিয়ে ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেন। ইবনে খালদুন ছিলেন তেমনই একজন। তিনি রাজা ছিলেন না, কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ছিলেন না যুদ্ধজয়ী সেনাপতি। তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল বাহিনী। অথচ রাজদরবার, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাসন, কারাবাস এবং সভ্যতার উত্থান-পতন তাঁকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছিল, যা কোনো পাঠশালায় একা বসে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। তিনি মানুষকে দেখেছিলেন ক্ষমতার খুব কাছে থেকে। দেখেছিলেন কীভাবে একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কীভাবে সম্পদ জমা হয়। কীভাবে করের বোঝা বাড়তে বাড়তে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। কীভাবে বিলাসিতা একটি বিজয়ী জাতির চরিত্র বদলে দেয়। আর কীভাবে যে জনগোষ্ঠী একসময় সাম্রাজ্য গড়ে, কয়েক প্রজন্ম পর তারাই সেই সাম্রাজ্যের ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল ছিল একটি গ্রন্থ। আল-মুকাদ্দিমা। আর সেই গ্রন্থের লেখক আবু যায়দ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন। আজ তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রদূত, ইতিহাসচিন্তার এক বিপ্লবী নাম এবং অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাথমিক পথিকৃৎ হি...

মাঝে মাঝে

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন সীমান্ত সৈনিক কাঁটাতারের বেড়াজাল ছেঁড়া শত্রুর অপেক্ষামান মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন লাইটহাউজ সুউচ্চ মিনার হতে পথহারা নাবিকের আশারআলো; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন ক্রনোমিটার বিচ্ছেদের প্রহর শেষে ফিরে আসার সুচতুর অনুমান। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন পুরনো বই, ধুলোমলিন পড়ে রই টেবিলের এককোণে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন কবিতার খাতা ভুল ব্যাকরণে লেখা তাই পড়েনি কেউ; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন বৃষ্টি ভেজা রংধনু এক আকাশ মন খারাপ শেষে কারো মন ভালো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন অভিযোগকারী আকাশ পানে চেয়ে রবকে বলি রোজ ভুলতে চাই যন্ত্রনাদের