![]() |
ফেরাউন থেকে মুসা, ফারুক থেকে মুরসি—এক শতাব্দীর ক্ষমতা, প্রতিরোধ ও পালাবদলের গল্প
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর।
সৌদি আরবের বাদশাহ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন সালমান বিন আবদুল আজিজ। সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন তাঁর তৎকালীন তরুণ ও উচ্চাভিলাষী পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি তখনও সৌদি সিংহাসনের সরাসরি উত্তরাধিকারী নন।
ওয়াশিংটনে একের পর এক বৈঠক চলছে। নানা আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরই মধ্যে এক বৈঠকে কথার মোড় ঘুরে যায় মিশরের দিকে।
মোহাম্মদ বিন সালমান তখন মিশরের আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকার নিয়ে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, সিসির সরকার কতদিন থাকবে, সেটি শেষ পর্যন্ত সৌদি নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
ঘটনাটি সত্য-মিথ্যার প্রশ্নে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
মিশর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশের বদলে মিশর নিয়ে এমন কথা বলা প্রয়োজন হয়ে পড়ে?
উত্তরটি বুঝতে হলে মিশরকে শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে।
মিশর এমন এক দেশ, যেখানে সংস্কৃতি যেমন রাজনীতি তৈরি করেছে, তেমনি রাজনীতিও ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্তের বহু দূরে।
আরব দুনিয়ায় একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—
“মিশর লেখে, লেবানন ছাপে, আর ইরাক পড়ে।”
অর্থাৎ মিশরে যে চিন্তা জন্ম নেয়, তা কেবল মিশরের মধ্যে আটকে থাকে না। সাহিত্য, সংগীত, সিনেমা, ধর্মীয় চিন্তা কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলন—কায়রোতে যে ঢেউ ওঠে, তার অভিঘাত পৌঁছে যায় গোটা আরব বিশ্বে।
তাই মিশরের ইতিহাস শুধু মিশরের ইতিহাস নয়।
এটি আরব বিশ্বের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফেরাউনের দেশ, মূসারও দেশ
মিশরের গল্প কয়েক হাজার বছরের পুরোনো।
এটি ফেরাউনদের দেশ।
কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, বিশাল প্রশাসন, সামরিক শক্তি এবং শাসকের প্রতি আনুগত্য—মিশরের প্রাচীন ইতিহাসে রাষ্ট্রক্ষমতার এই বৈশিষ্ট্যগুলো বারবার দেখা যায়।
কিন্তু এই একই মাটিই মূসা আলাইহিস সালামের।
কুরআনের বর্ণনায় ফেরাউন যখন ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় বনি ইসরাইলের পুত্রসন্তানদের হত্যা করছিল, তখন যে শিশুকে সে নিজের ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই শিশুই তার প্রাসাদে বড় হয়েছিল।
ক্ষমতা আর প্রতিরোধের এই দ্বন্দ্ব তাই মিশরের ইতিহাসে নতুন কোনো বিষয় নয়।
ফেরাউন বনাম মুসার গল্পকে যদি মিশরের দীর্ঘ রাজনৈতিক স্মৃতির একটি প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, তাহলে পরবর্তী হাজার বছরের ইতিহাসেও তার ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।
একদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ।
অন্যদিকে সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ।
এই দ্বন্দ্বই যেন মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘতম সুর।
ঔপনিবেশিকতার ছায়ায় আধুনিক মিশর
তবে আমাদের গল্পকে কয়েক হাজার বছর পেছনে নিয়ে গেলে এই লেখা শেষ হওয়ার আগেই মিশরের ইতিহাস শেষ হয়ে যাবে।
তাই আসা যাক আধুনিক যুগে।
উনিশ শতকের শেষভাগে মিশর তখন অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট দেশটিকে ক্রমশ ইউরোপীয় শক্তির ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছিল।
১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা মিশর দখল করে এবং পরবর্তী কয়েক দশকে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে তাদের প্রভাব গভীর হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে মিশরের সমাজে আধুনিকতা, জাতীয়তাবাদ, পশ্চিমা শিক্ষা ও ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাবও বাড়তে থাকে।
একই সময়ে জন্ম নেয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা।
একটি ছিল মিশরীয় জাতীয়তাবাদ।
অন্যটি ছিল আরব জাতীয়তাবাদ।
উভয়ের মধ্যেই ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল, যদিও তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্য এক ছিল না।
এই সময় মিশরে সংস্কারবাদী ইসলামি চিন্তাও বিকশিত হচ্ছিল। মুহাম্মদ আবদুহর মতো চিন্তাবিদ ইসলামি ঐতিহ্য, শিক্ষা ও আধুনিকতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবছিলেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে যেমন স্যার সাইয়্যিদ আহমদ খান মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও আধুনিকতার প্রশ্নে নতুন চিন্তার সূচনা করেছিলেন, মিশরেও তেমনই এক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন চলছিল।
এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই তৈরি হচ্ছিল ভবিষ্যতের মিশর।
আর সেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একজনের নাম তখনও কেউ জানত না।
হাসান আল-বান্না।
কায়রোর এক তরুণ প্রচারক
কায়রোর একটি কফিহাউস।
চারদিকে মানুষের কথাবার্তা। কেউ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছে, কেউ দৈনন্দিন জীবন নিয়ে।
হঠাৎ একটি ধাতব গ্লাস পড়ে যাওয়ার শব্দ।
সবাই তাকাল।
এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছেন।
তিনি কথা বলতে শুরু করলেন।
দ্বীন, সমাজ এবং মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর বক্তব্য ধীরে ধীরে আশপাশের মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিল।
এই তরুণ ছিলেন হাসান আল-বান্না।
তিনি শুধু বক্তা ছিলেন না। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষমতা।
১৯২৮ সালে ইসমাইলিয়ায় হাসান আল-বান্না ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী প্রতিষ্ঠা করেন মুসলিম ব্রাদারহুড বা আল-ইখওয়ান আল-মুসলিমুন।
প্রথম দিকে এটি ছিল ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার ও সংগঠিত দাওয়াহকেন্দ্রিক একটি আন্দোলন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটি মিশরের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়।
ব্রাদারহুডের শক্তি শুধু তার বক্তৃতায় ছিল না।
ছিল সংগঠনে।
ছিল শৃঙ্খলায়।
ছিল সামাজিক নেটওয়ার্কে।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করার ক্ষমতায়।
হাসান আল-বান্না বই লেখার চেয়ে মানুষ তৈরি করাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন—এমন একটি ধারণা তাঁর অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
তাঁর আন্দোলনের সঙ্গে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশার শিক্ষিত মানুষ যুক্ত হতে শুরু করেন।
একটি ধর্মীয় আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছিল একটি সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তিতে।
রাজপ্রাসাদের সঙ্গে সংঘাত
মিশরের তখন রাজতন্ত্র।
রাজা ফারুক ক্ষমতায়।
ব্রিটিশ প্রভাব তখনও প্রবল।
ব্রাদারহুড ক্রমশ ব্রিটিশ প্রভাবের অবসান এবং মিশরীয় সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি মূল্যবোধের ভূমিকা বৃদ্ধির দাবি তুলতে থাকে।
সংগঠনটির জনপ্রিয়তা বাড়ছিল।
শহরে শহরে সমাবেশ হচ্ছিল।
মানুষ যুক্ত হচ্ছিল।
আর রাজপ্রাসাদ ক্রমশ উদ্বিগ্ন হচ্ছিল।
১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে রাজতন্ত্র ও ব্রাদারহুডের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিশরের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নও মিশরের রাজনীতিতে বড় হয়ে উঠছিল।
১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে যায়।
ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে সরকারি দমন-পীড়ন তীব্র হয়। সংগঠনটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন।
তারপর আসে ১৯৪৯ সাল।
হাসান আল-বান্না কায়রোতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
তাঁর বয়স তখন মাত্র ৪২ বছর।
রাজতন্ত্র হয়তো ভেবেছিল, একজন নেতাকে সরিয়ে দিলে আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু ইতিহাস তখন অন্য গল্প লিখছিল।
কারণ আন্দোলনের নেতা মারা গেলেও আন্দোলনের ধারণা বেঁচে ছিল।
রাজা ফারুক গেলেন, এলো সেনাবাহিনী
১৯৪৮ সালের যুদ্ধে মিশরের পরাজয় দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত নড়িয়ে দেয়।
সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
১৯৫২ সালে ফ্রি অফিসার্স আন্দোলনের মাধ্যমে রাজা ফারুক ক্ষমতাচ্যুত হন।
রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।
মিশর প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
আর অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন এক তরুণ সেনা কর্মকর্তা—
গামাল আবদেল নাসের।
নাসেরের মিশর ছিল আরব জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রীয় আধুনিকীকরণ এবং সামরিক শক্তির মিশ্রণ।
অনেকের কাছে তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আরব জাতীয়তাবাদের প্রতীক।
কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দ্রুত সংঘাতে পরিণত হয়।
১৯৫৪ সালে নাসেরকে হত্যার একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়।
হাজার হাজার সদস্য গ্রেপ্তার হন।
কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
আর এই কারাগার থেকেই জন্ম নেয় এমন এক রাজনৈতিক চিন্তা, যার প্রভাব পরবর্তী দশকগুলোতে শুধু মিশরে নয়, গোটা ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় পড়বে।
তার নাম—
সাইয়্যিদ কুতুব।
কারাগারে জন্ম নেয় যে চিন্তা
সাইয়্যিদ কুতুব প্রথমে সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পশ্চিমা সমাজ ও পুঁজিবাদ-কমিউনিজমের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি ক্রমশ ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন।
মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগ দেওয়ার পর তাঁর চিন্তা আরও রাজনৈতিক রূপ নেয়।
নাসের সরকারের কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানোর সময় তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “মা'আলিম ফি আল-তারিক” বা Milestones লেখেন।
গ্রন্থটি পরবর্তী ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে।
কিন্তু একই বই তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগেরও ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৬৬ সালের ২৯ আগস্ট সাইয়্যিদ কুতুবকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তিনি শহীদ হলেন।
কিন্তু তাঁর লেখা রয়ে গেল।
আর ইতিহাসের অদ্ভুত নিয়ম হলো, অনেক সময় একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তাঁর চিন্তার জীবন তখনই শুরু হয়।
নাসেরের পর
নাসেরের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এলেন আনোয়ার সাদাত।
ব্রাদারহুডের ওপর দমন-পীড়নের মাত্রা কিছুটা কমে।
কিন্তু সাদাতের ইসরায়েল নীতির বিরোধিতা করে মিশরের ইসলামপন্থী আন্দোলনের একাংশ আরও র্যাডিক্যাল হয়ে ওঠে।
১৯৮১ সালে আনোয়ার সাদাত আততায়ীর হামলায় নিহত হন।
এরপর ক্ষমতায় আসেন হোসনি মুবারক।
শুরু হয় আরও দীর্ঘ এক অধ্যায়।
প্রায় তিন দশক ধরে মুবারক মিশরের ক্ষমতায় ছিলেন।
ব্রাদারহুড আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও সংগঠনটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব ধরে রাখে। স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে তাদের সদস্যরা নির্বাচনে অংশ নিতেন এবং সংসদেও জায়গা করে নিতেন।
রাষ্ট্র আর ব্রাদারহুডের এই টানাপোড়েন চলতেই থাকে।
কিন্তু তখন কেউ জানত না, কয়েক বছরের মধ্যেই মিশরের রাস্তায় এমন কিছু ঘটবে, যা পুরো আরব বিশ্বের রাজনীতিকে কাঁপিয়ে দেবে।
২০১১: ত্রিশ বছরের দেয়াল ভেঙে পড়ে
২০১১ সাল।
তিউনিসিয়া থেকে যে আগুন শুরু হয়েছিল, তা ছড়িয়ে পড়ে আরব বিশ্বে।
তারপর সেই আগুন পৌঁছে যায় কায়রোতে।
তাহরির স্কয়ারে মানুষ জমা হতে শুরু করে।
দাবি একটাই নয়।
দুর্নীতি, বেকারত্ব, দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা—সবকিছু মিলিয়ে ক্ষোভ জমেছিল বহুদিন।
হোসনি মুবারকের তিন দশকের শাসনের বিরুদ্ধে লাখো মানুষ রাস্তায় নামে।
মাত্র ১৮ দিনের আন্দোলনের পর ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালে মুবারক পদত্যাগ করেন।
একটি যুগের অবসান ঘটে।
কিন্তু প্রশ্ন ছিল—
এরপর কে?
মিশরের রাষ্ট্রযন্ত্র তখনও পুরোনো কাঠামোর ভেতর।
সেনাবাহিনী শক্তিশালী।
রাজনৈতিক দলগুলো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
আর বহু দশক ধরে দমন-পীড়নের মধ্যেও সংগঠন ধরে রাখা মুসলিম ব্রাদারহুড তখন প্রস্তুত।
মুরসি: ব্রাদারহুডের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা
২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখার প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি জয়ী হন।
তিনি হয়ে ওঠেন মিশরের প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক প্রেসিডেন্ট।
এটি ছিল ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
দশকের পর দশক রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পর যে সংগঠনটির নেতারা কারাগারে ছিলেন, সেই সংগঠনের একজন নেতা এখন রাষ্ট্রপতির প্রাসাদে।
কায়রোর রাস্তায় আনন্দ।
কিন্তু একই সময়ে শুরু হয় নতুন সংঘাত।
রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোনো অংশগুলোর সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক জটিল হতে থাকে।
সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা—সবকিছু নিয়ে সংঘাত বাড়তে থাকে।
২০১২ সালের নভেম্বরে মুরসি এমন একটি সাংবিধানিক ঘোষণা দেন, যা তাঁর সিদ্ধান্তকে বিচারিক পর্যালোচনা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। বিরোধিতা শুরু হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির কাছ থেকে।
একদিকে ছিল ব্রাদারহুডের সমর্থকরা।
অন্যদিকে ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থী, বামপন্থী, পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ এবং মুরসির নীতির বিরোধীরা।
মিশর আবার বিভক্ত।
কায়রোর ঘটনাকে রিয়াদ ও আবুধাবি কীভাবে দেখছিল?
এখানেই মিশরের গল্প আর শুধু মিশরের গল্প থাকে না।
কারণ মিশরে প্রথমবারের মতো একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে।
উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর কাছে এটি ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।
বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো একটি আন্তঃদেশীয় সংগঠন যদি নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে পারে, তাহলে তার প্রভাব অন্য আরব দেশেও পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।
২০০৬ সালের একটি মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে তৎকালীন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, অবাধ নির্বাচন হলে সংগঠনটি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ ২০১১-এর আগেই উপসাগরীয় কিছু শাসকের কাছে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক উত্থান একটি নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল।
২০১২-১৩ সালে মিশরের পরিস্থিতি আরও সংকটময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্বেগও তীব্র হয়।
বিপ্লব : প্রতিবিপ্লব
২০১৩ সালের জুন।
মুরসি সরকারের বিরুদ্ধে আবারও বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়।
৩০ জুন লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নামে।
সরকারবিরোধী আন্দোলন দ্রুত তীব্র হয়।
৩ জুলাই সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ঘোষণা করেন, মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে।
সেনাবাহিনী তাঁকে আটক করে।
মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হন।
ঘটনাটিকে অনেক গবেষক ও পর্যবেক্ষক সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন; অন্যদিকে মুরসিবিরোধী পক্ষ এটিকে ব্যাপক গণবিক্ষোভের পর সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।
যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—
মিশরের নির্বাচিত সরকার এক বছরের মধ্যেই ক্ষমতা হারিয়েছিল।
আর এরপর শুরু হয় মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে আধুনিক মিশরের অন্যতম কঠোর দমন-পীড়ন।
রাবা: রক্তসমুদ্র
কায়রোর রাবা আল-আদাবিয়া স্কয়ারে মুরসির সমর্থকেরা অবস্থান নিয়েছিল।
তাদের দাবি ছিল, নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে দিতে হবে।
সরকার সেই অবস্থান ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৪ আগস্ট ২০১৩।
রাবা ও নাহদা স্কয়ারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান শুরু হয়।
হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয় বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা নথিভুক্ত করেছে। Human Rights Watch পরবর্তী তদন্তে রাবা হত্যাকাণ্ডকে ব্যাপক ও পরিকল্পিত প্রাণঘাতী দমন হিসেবে বর্ণনা করে এবং অন্তত ৮১৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য যাচাই করেছিল; সংস্থাটি ঘটনাটিকে সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবেও চিহ্নিত করে।
মুরসি সরকারের সাবেক সহযোগীদেরও আটক করা হয়। Human Rights Watch জানায়, ৩ জুলাইয়ের পর মুরসির প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময় গোপন আটক রাখা হয়েছিল।
মিশরের রাজনীতিতে আবার ফিরে আসে পুরোনো দৃশ্য।
কারাগার।
গ্রেপ্তার।
নিষেধাজ্ঞা।
রাষ্ট্রীয় দমন।
কিন্তু এবার সময় বদলে গেছে।
এবার সবকিছু সরাসরি ক্যামেরার সামনে ঘটছে।
উপসাগরীয় অর্থ ও মিশরের নতুন ক্ষমতার কাঠামো
মুরসিকে সরিয়ে দেওয়ার পর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত নতুন মিশরীয় নেতৃত্বকে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়।
২০১৬ সালের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে মিশরকে দেওয়া বা ঋণ হিসেবে সরবরাহ করা অর্থের পরিমাণ কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে Human Rights Watch-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মিশরের ওপর নিয়ন্ত্রণ শুধু মিশরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়।
বরং মিশরকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে আরব বিশ্বের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঢেউকে নিয়ন্ত্রণ করা।
এটিই সেই “ইনস্যুরেন্স পলিসি” তত্ত্ব।
এই তত্ত্বের যুক্তি হলো—
যদি মিশরে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে এবং সেই সরকার দীর্ঘদিন টিকে যায়, তাহলে অন্য আরব দেশের জনগণও একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারে।
একটি দেশের নির্বাচন অন্য দেশের রাজনীতিকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
একটি দেশের সফল আন্দোলন অন্য দেশের আন্দোলনের সাহস বাড়াতে পারে।
আর একটি সফল রাজনৈতিক মডেল হয়ে উঠতে পারে অন্যদের জন্য উদাহরণ।
সেই কারণেই, এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মিশরের রাজনৈতিক পরীক্ষাকে থামিয়ে দেওয়া উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর নিরাপত্তা হিসাবের অংশ হয়ে উঠেছিল।
উপসাগরীয় নেতৃত্ব যে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিজেদের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখত, তার প্রমাণ ২০১১-এর আগের কূটনৈতিক নথিতেও পাওয়া যায়।
কেন মিশর এত বড়?
এখন আবার ফিরে আসা যাক সেই প্রশ্নে—
মিশর কেন?
কারণ মিশর শুধু আয়তন বা জনসংখ্যার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
মিশর দীর্ঘদিন ধরে আরব বিশ্বের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর একটি।
কায়রোর বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদপত্র, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সংগীত এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
মিশরের জনপ্রিয় সংস্কৃতি একসময় গোটা আরব বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে।
উম্মে কুলসুমের কণ্ঠ কায়রোর সীমানা পেরিয়ে আরব দুনিয়ার ঘরে ঘরে পৌঁছেছিল।
আহমদ শাওকির কবিতা আরবি সাহিত্যজগতে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিল।
আল-আজহার হয়ে উঠেছিল ইসলামি জ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
আর রাজনৈতিকভাবে—
মিশরের রাজতন্ত্রের পতন আরব প্রজাতন্ত্রগুলোর উত্থানে প্রভাব ফেলেছিল।
নাসেরের আরব জাতীয়তাবাদ সীমান্ত পেরিয়েছিল।
মুসলিম ব্রাদারহুডের সংগঠন ও চিন্তা বিভিন্ন আরব দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
২০১১ সালের তাহরির স্কয়ারও একইভাবে আরব বিশ্বের রাজনৈতিক কল্পনাকে বদলে দিয়েছিল।
তাই মিশরে যে পরিবর্তন ঘটে, তার অভিঘাত অনেক সময় মিশরের সীমানায় থেমে থাকে না।
কিন্তু গল্প কি এখানেই শেষ?
আজকের মিশরে সিসি ক্ষমতায়।
মুসলিম ব্রাদারহুড রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে।
হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে।
অনেক নেতা-কর্মী কারাগারে।
অনেকে দেশ ছেড়েছেন।
কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন।
২০১৩-এর পর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটি আবার সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর শক্তিশালী ভূমিকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। Human Rights Watch-এর ২০১৫ সালের মূল্যায়নেও মুরসির অপসারণের পর মিশরে ব্যাপক দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন এখানেই।
একটি ধারণাকে কি শুধু কারাগার দিয়ে শেষ করা যায়?
একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে কি শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মুছে ফেলা যায়?
নাকি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা চাপ একসময় অন্য কোনো রূপে ফিরে আসে?
মিশরের ইতিহাসের উত্তর এখনো লেখা শেষ হয়নি।
মিশর: একটি দেশের চেয়েও বেশি কিছু
ফেরাউন থেকে মুসা।
সুলতান থেকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ।
রাজা ফারুক থেকে নাসের।
নাসের থেকে সাদাত।
সাদাত থেকে মুবারক।
মুবারক থেকে মুরসি।
মুরসি থেকে সিসি।
এক শতাব্দীরও কম সময়ে মিশর বারবার ক্ষমতার মুখ বদলেছে।
কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি।
ক্ষমতা ও প্রতিরোধের সংঘাত।
কখনো তার ভাষা ছিল জাতীয়তাবাদ।
কখনো স্বাধীনতা।
কখনো ইসলামি পুনর্জাগরণ।
কখনো গণতন্ত্র।
কখনো অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার।
কিন্তু প্রতিবারই প্রশ্নটি ফিরে এসেছে—
রাষ্ট্র কার?
ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?
শাসক কি জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে?
আর জনগণ যখন রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিমত করবে, তখন রাষ্ট্র তার সঙ্গে কী করবে?
মিশরের গল্প তাই শুধু মুসলিম ব্রাদারহুডের গল্প নয়।
এটি শুধু নাসের, মুবারক, মুরসি কিংবা সিসির গল্পও নয়।
এটি একটি সমাজের দীর্ঘ রাজনৈতিক স্মৃতির গল্প।
যে মাটিতে ফেরাউন দাঁড়িয়েছিল, সেই মাটিতেই মুসা দাঁড়িয়েছিলেন।
যে শহরে রাজপ্রাসাদ ছিল, সেই শহরের রাস্তাতেই তাহরির স্কয়ার তৈরি হয়েছিল।
আর যে সংগঠনকে একের পর এক শাসক শেষ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই সংগঠনই একদিন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছেছিল।
তারপর আবার ক্ষমতা হারিয়েছে।
ইতিহাসের চাকা আবার ঘুরেছে।
কিন্তু মিশরের ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় বারবার মনে করিয়ে দেয়
ক্ষমতার প্রাসাদ যত শক্তই হোক, একটি দেশের রাজনৈতিক গল্প কখনো শুধু প্রাসাদের ভেতরে লেখা হয় না।
কখনো তা লেখা হয় কারাগারে।
কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে।
কখনো মসজিদের উঠানে।
কখনো সংবাদপত্রের পাতায়।
আর কখনো লাখো মানুষের পায়ের শব্দে।
মিশর সেই শব্দ শুনেছে বহুবার।
সম্ভবত এ কারণেই মিশরের রাজনীতি বোঝার অর্থ শুধু মিশরকে বোঝা নয়।
আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ভবিষ্যত দেখা।

Comments
Post a Comment