Skip to main content

উস্তাদ নোমান আলী খানের কুরআন ও বৈশ্বিক অর্থনীতি | পর্ব ০৩


অর্থনীতি, ক্ষমতা, ভোক্তা সংস্কৃতি

অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা সাধারণত কিছু পরিচিত শব্দের কাছে ফিরে যাই—উৎপাদন, বাজার, ব্যবসা, বিনিয়োগ, ভোগ, মুনাফা। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে অর্থনীতির প্রশ্নটা আরও গভীরে গিয়ে মানুষের চরিত্রকে স্পর্শ করে।

কারণ মানুষ যখন অর্থ উপার্জন করে, তখন সে শুধু টাকা তৈরি করে না। সে সম্পর্ক তৈরি করে, প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, বাজার তৈরি করে, সমাজের একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতিও তৈরি করে। একইভাবে মানুষ যখন অর্থ ব্যয় করে, তখন সে শুধু কোনো পণ্য কিনছে না। সে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কোন ধরনের ব্যবসা টিকে থাকবে, কোন ধরনের সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে এবং কোন মূল্যবোধ ধীরে ধীরে সমাজের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হবে।

এই জায়গাতেই উস্তাদ নোমান আলী খানের আলোচনায় কুরআনের অর্থনৈতিক দর্শন আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে।

অর্থনীতি কি মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য, নাকি মানুষই অর্থনীতির প্রয়োজন পূরণের উপকরণ হয়ে যাচ্ছে?


কারূনের সম্পদ, আর কারূনের মানসিকতা

কুরআনে কারূনের ঘটনা শুধু একজন অতিধনী মানুষের গল্প নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সম্পদকে দেখার একটি মানসিকতা।

কারূনের সমস্যা শুধু তার কাছে বিপুল সম্পদ ছিল, এমন নয়। সমস্যা হলো, সম্পদ এমন এক মানসিকতা তৈরি করেছিল যেখানে মানুষের মূল্যও সম্পদের হিসাবের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে।

এই মানসিকতাকে উস্তাদ নোমান আলী খান “কারূন মাইন্ডসেট” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

এই মানসিকতায় মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখা হয় না। তাকে দেখা হয় সম্পদ অথবা দায় হিসেবে। কে আমার জন্য লাভজনক, কে আমার জন্য বোঝা, কে আমার কাজে আসবে, কে আমাকে এগিয়ে দেবে—মানুষের মূল্যায়ন ধীরে ধীরে এই হিসাবের মধ্যে আটকে যায়।

এখানেই অর্থনীতি তার মানবিক চরিত্র হারাতে শুরু করে।

সম্পদ তখন আর একটি মাধ্যম থাকে না। সেটিই হয়ে ওঠে উদ্দেশ্য। আর মানুষ হয়ে যায় সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর একটি উপকরণ।

কুরআনের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এই জায়গাতেই অন্যরকম। সম্পদ মানুষের হাতে থাকবে, কিন্তু মানুষ সম্পদের দাস হবে না।


ব্যবসা যখন বিশ্বাস হারায়

একটি বাজার শুধু দোকান, কোম্পানি আর চুক্তির সমষ্টি নয়। বাজারের ভিতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অদৃশ্য সম্পদ হলো বিশ্বাস।

আমি যে পণ্য কিনছি, সেটি যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই কি?
আমি যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করছি, তার শর্ত কি সত্যিই পরিষ্কার?
যে ব্যবসায়ীর সঙ্গে লেনদেন করছি, সে কি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে ভুল তথ্য দিচ্ছে?

যখন মিথ্যা উপস্থাপন, প্রতারণামূলক চুক্তি এবং অসততা ব্যবসার স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পরিণত হয়, তখন ক্ষতি শুধু একজন ক্রেতার হয় না। ধীরে ধীরে পুরো সমাজের নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে যায়।

কুরআনের আলোচনায় ব্যবসার নৈতিকতা তাই নিছক ব্যক্তিগত সততার বিষয় নয়। এটি সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।

কারণ একটি সমাজে মানুষ যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করতে না পারে, তাহলে প্রতিটি লেনদেন সন্দেহের ওপর দাঁড়ায়। প্রতিটি চুক্তির সঙ্গে বাড়ে ভয়। প্রতিটি ব্যবসায় বাড়ে ঝুঁকি।

অর্থাৎ ব্যবসায়িক অনৈতিকতা শেষ পর্যন্ত বাজারের বাইরের জীবনকেও প্রভাবিত করে।

একটি সুস্থ অর্থনীতি তাই শুধু বেশি ব্যবসার অর্থনীতি নয়। এটি এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে মানুষ জানে তার সঙ্গে প্রতারণা করা হবে না।


বাজারের আরেক প্রান্তে: ভোক্তা মানুষ

কিন্তু সমস্যার সবটুকু ব্যবসায়ীর দিকে তাকিয়ে বোঝা যায় না।

কারণ বাজারের আরেকটি শক্তিশালী চরিত্র হলো ভোক্তা।

আধুনিক বিজ্ঞাপন মানুষের প্রয়োজনের পাশাপাশি তার দুর্বলতাকেও চিনতে শেখে। মানুষ কোথায় নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করে, কোথায় সে একাকী, কোথায় তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়, কোথায় সে হঠাৎ কিছু কিনে ফেলতে চায়, কোথায় অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে করে—এই অনুভূতিগুলোও বাজারের ভাষায় পরিণত হতে পারে।

তখন বিজ্ঞাপন শুধু বলে না, “এই পণ্যটি তোমার প্রয়োজন।”

বরং কখনো কখনো তার বার্তা হয়ে দাঁড়ায়:

“তুমি এখনো যথেষ্ট নও। এই পণ্যটি তোমাকে আরও মূল্যবান করে তুলবে।”

এভাবেই ভোগ ধীরে ধীরে প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।

মানুষ পণ্য কেনে শুধু পণ্য হিসেবে নয়। সে কিনতে চায় একটি অনুভূতি, একটি মর্যাদা, একটি পরিচয়, কখনো এমনকি এমন একটি জীবন, যা বাস্তবে তার নিজের নয়।

এখানেই কারূনের মানসিকতা ভোগের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

কারূন শুধু বাইরে কোথাও নেই। সে মানুষের মাথার ভেতরেও জায়গা করে নিতে পারে।


সালাত: মানুষকে আবার ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনা

এই জায়গায় এসে উস্তাদ নোমান আলী খানের আলোচনায় সালাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।

সালাতকে আমরা সাধারণত ইবাদত হিসেবে বুঝি, এবং অবশ্যই সেটিই তার মূল পরিচয়। কিন্তু এর প্রভাব মানুষের জীবনকে আরও বিস্তৃতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

মানুষের ভেতরে আকাঙ্ক্ষা আছে। সে বেশি চায়। দ্রুত চায়। অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে। কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জমায়, আবার কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যয় করে।

সালাত সেই মানুষকে বারবার থামায়।

দিনের ব্যস্ততার মাঝখানে মানুষকে তার প্রকৃত কেন্দ্রের দিকে ফিরিয়ে আনে। তাকে মনে করিয়ে দেয়, তার জীবন শুধু বাজার, পণ্য, আয় এবং ভোগের সমষ্টি নয়।

অর্থাৎ সালাত মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধ্বংস করে না। বরং তাকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের মধ্যে রাখে।

একজন কুরআন-প্রভাবিত ভোক্তা তাই এমন মানুষ নয়, যে কিছুই কিনবে না। বরং সে জানবে কেন কিনছে, কতটা কিনছে এবং তার অর্থ কোথায় যাচ্ছে।


সম্পদ জমে থাকবে না, চলবে

এরপর আসে সম্পদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একটি সমাজে সম্পদ যদি অল্প কিছু মানুষের হাতে ক্রমাগত জমা হতে থাকে, তাহলে অর্থনীতি শুধু ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ায় না, বরং সুযোগের ব্যবধানও বাড়াতে পারে।

উস্তাদ নোমান আলী খান কুরআনের উত্তরাধিকার আইনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

মানুষ মারা গেলে তার সম্পদ এক জায়গায় আটকে থাকার পরিবর্তে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়। ফলে সম্পদ একটি পরিবারের একক কেন্দ্রের মধ্যে চিরস্থায়ীভাবে জমে থাকার সুযোগ কমে যায়।

এখানে অর্থনীতির একটি গভীর নীতি দেখা যায়:

সম্পদ শুধু সৃষ্টি করলেই হবে না, সমাজের ভেতর তার চলাচলও থাকতে হবে।

উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদ নতুন প্রজন্মের হাতে যায়। নতুন মানুষ নতুনভাবে তা ব্যবহার করতে পারে। কেউ ব্যবসা করতে পারে, কেউ শিক্ষা নিতে পারে, কেউ বিনিয়োগ করতে পারে, কেউ নিজের জীবনের অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ পেতে পারে।

এভাবে সম্পদ স্থির হয়ে পড়ে না। তার প্রবাহ নতুন মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।

কুরআনের অর্থনৈতিক দর্শনে তাই সম্পদকে শুধু সঞ্চয়ের বস্তু হিসেবে দেখা হয় না। তার সামাজিক গতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।


একা শক্তিশালী হওয়া নয়, একসঙ্গে দাঁড়ানো

কিন্তু এখানেই আলোচনাটি ব্যক্তি থেকে সমাজে এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের দিকে চলে যায়।

একটি মুসলিম সমাজ যদি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে, প্রত্যেকে যদি শুধু নিজের স্বার্থে কাজ করে এবং একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতার কাঠামো গড়ে না তোলে, তাহলে তার শক্তি খণ্ডিত হয়ে যায়।

এখানে উস্তাদ নোমান আলী খান কুরআনের “উইলায়াহ” বা পারস্পরিক মিত্রতা ও জোটের ধারণার দিকে দৃষ্টি দেন।

এর অর্থ শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়। এর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং একে অন্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর ধারণাও রয়েছে।

একটি বড় দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য যেমন পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসা করে, পণ্য ও সেবা আদান-প্রদান করে, একে অন্যের বাজারকে শক্তিশালী করে, তেমনি মুসলিম দেশ ও সমাজগুলোর মধ্যেও আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক সহযোগিতা গড়ে উঠতে পারে।

প্রতিটি দেশকে সবকিছু নিজে তৈরি করতে হবে, এমন নয়।

কেউ হয়তো কৃষিতে শক্তিশালী।
কেউ প্রযুক্তিতে।
কেউ উৎপাদনে।
কেউ জ্ঞান ও শিক্ষায়।
কেউ বন্দর ও বাণিজ্যে।

এই শক্তিগুলো যদি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।

এর ফলে নির্ভরতা কমতে পারে, নিজেদের মধ্যে ব্যবসা বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।

এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আহ্বান নয়। বরং নিজেদের মধ্যে এমন শক্তিশালী সহযোগিতা গড়ে তোলার চিন্তা, যার ফলে একটি সমাজ অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে না থাকে।


অর্থনীতি শুধু টাকা নয়, সম্পর্কও

এই পুরো আলোচনার ভেতর দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অর্থনীতি কখনোই শুধু সংখ্যার বিষয় নয়।

একটি ব্যবসার পেছনে একজন মানুষ আছে।
একটি পণ্যের পেছনে একজন শ্রমিক আছে।
একটি বিজ্ঞাপনের পেছনে মানুষের মনস্তত্ত্ব আছে।
একটি সম্পদের পেছনে একটি পরিবার আছে।
একটি উত্তরাধিকার বণ্টনের পেছনে একটি নতুন প্রজন্ম আছে।
আর একটি দেশের অর্থনীতির পেছনে আছে অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ।

তাই অর্থনৈতিক শক্তি যদি নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে সেই শক্তিই একসময় সমাজের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে নৈতিকতা যদি বাস্তব অর্থনৈতিক কাঠামো ছাড়া শুধু বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাতেও সমাজ বদলায় না।

কুরআনের শিক্ষা এই দুই দিককে পাশাপাশি রাখতে চায়।

উপার্জন থাকবে, কিন্তু প্রতারণা নয়।
ব্যবসা থাকবে, কিন্তু শোষণ নয়।
সম্পদ থাকবে, কিন্তু কারূনের মানসিকতা নয়।
ভোগ থাকবে, কিন্তু উন্মত্ততা নয়।
সঞ্চয় থাকবে, কিন্তু সম্পদের স্থবিরতা নয়।
ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি থাকবে, কিন্তু সমাজকে ভুলে গিয়ে নয়।
শক্তি থাকবে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা নয়।


শেষ কথা: একজন কুরআন-প্রভাবিত মানুষ

এই তিন পর্বের আলোচনাকে যদি এক জায়গায় এনে দাঁড় করানো যায়, তাহলে দেখা যায়, কুরআন অর্থনীতিকে মানুষের জীবনের বাইরে কোনো আলাদা জগৎ হিসেবে দেখছে না।

মানুষ কীভাবে উপার্জন করবে, কীভাবে ব্যবসা করবে, কীভাবে ব্যয় করবে, কীভাবে সম্পদ বণ্টিত হবে, কীভাবে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষকে সমাজের অংশ করে রাখা হবে, কীভাবে অতিরিক্ত ভোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করা হবে এবং কীভাবে একটি সমাজ নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তিকে সম্মিলিতভাবে কাজে লাগাবে, সবকিছুই বৃহত্তর নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।

এখানে অর্থনীতি মানুষের ওপর বসে থাকা কোনো অদৃশ্য শক্তি নয়।

মানুষই অর্থনীতিকে তৈরি করে।

আর মানুষ যেমন হবে, তার অর্থনীতিও ধীরে ধীরে তেমন হয়ে উঠবে।

লোভী মানুষ লোভের বাজার তৈরি করবে।
প্রতারক মানুষ প্রতারণার বাজার তৈরি করবে।
অতিরিক্ত ভোগে অভ্যস্ত মানুষ অতিভোগের বাজার তৈরি করবে।
আর দায়িত্বশীল মানুষ এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে, যেখানে সম্পদ সৃষ্টি হবে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা হারাবে না।

সেই কারণেই কুরআনের অর্থনৈতিক শিক্ষা শেষ পর্যন্ত শুধু এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না যে, “কীভাবে আরও বেশি সম্পদ তৈরি করা যায়?”

তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:

সম্পদ তৈরি করার পর আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠব?

কারূনের গল্পের শিক্ষা এখানেই সবচেয়ে গভীর। সমস্যা শুধু কারূনের হাতে কত সম্পদ ছিল, তা নয়। সমস্যা ছিল সেই সম্পদ তার হৃদয়, তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার সমাজের সঙ্গে সম্পর্ককে কীভাবে বদলে দিয়েছিল।

কুরআন তাই সম্পদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় সম্পদের সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, যেখানে মানুষ সম্পদের চেয়ে ছোট হয়ে যায়।

একজন কুরআন-প্রভাবিত ব্যবসায়ী তাই শুধু লাভের হিসাব জানবে না, আমানতের হিসাবও জানবে।
একজন কুরআন-প্রভাবিত ভোক্তা শুধু নিজের ইচ্ছা জানবে না, নিজের সীমাও জানবে।
একজন কুরআন-প্রভাবিত ধনী শুধু কীভাবে আরও বাড়ানো যায় তা ভাববে না, কীভাবে তার অতিরিক্ত সম্পদ সমাজের জন্য উপকারী হতে পারে তাও ভাববে।
আর একটি কুরআন-প্রভাবিত সমাজ শুধু নিজের সমৃদ্ধি চাইবে না, এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামোও চাইবে যেখানে মানুষ একে অন্যের শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এটাই এই আলোচনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা:

অর্থনীতির কেন্দ্রে যদি মানুষ থাকে, তবে সম্পদ তার সেবক হতে পারে।
আর অর্থনীতির কেন্দ্রে যদি শুধু সম্পদ থাকে, তবে মানুষই একদিন তার সেবকে পরিণত হয়।

কুরআনের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সেই জায়গায় মানুষকে আবার তার আসল অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে চায়—
সম্পদের মালিক হিসেবে নয়, সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী হিসেবে; বাজারের ভোক্তা হিসেবে নয়, সমাজের নির্মাতা হিসেবে।

আর তখন অর্থনীতি শুধু ধনী হওয়ার পথ থাকে না।

এটি হয়ে ওঠে এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে উপার্জনও ইবাদত হতে পারে, ব্যয়ও দায়িত্ব হতে পারে, ব্যবসাও সমাজসেবার মাধ্যম হতে পারে এবং সম্পদও মানুষের কল্যাণের পথে প্রবাহিত হতে পারে।

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

ইবনে খালদুন: রাজদরবার থেকে সভ্যতার অন্তর্গত সূত্রের সন্ধানে

ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল একটি যুগের প্রতিনিধি নন। তাঁরা তাঁদের সময়কে পেরিয়ে ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেন। ইবনে খালদুন ছিলেন তেমনই একজন। তিনি রাজা ছিলেন না, কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ছিলেন না যুদ্ধজয়ী সেনাপতি। তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল বাহিনী। অথচ রাজদরবার, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাসন, কারাবাস এবং সভ্যতার উত্থান-পতন তাঁকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছিল, যা কোনো পাঠশালায় একা বসে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। তিনি মানুষকে দেখেছিলেন ক্ষমতার খুব কাছে থেকে। দেখেছিলেন কীভাবে একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কীভাবে সম্পদ জমা হয়। কীভাবে করের বোঝা বাড়তে বাড়তে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। কীভাবে বিলাসিতা একটি বিজয়ী জাতির চরিত্র বদলে দেয়। আর কীভাবে যে জনগোষ্ঠী একসময় সাম্রাজ্য গড়ে, কয়েক প্রজন্ম পর তারাই সেই সাম্রাজ্যের ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল ছিল একটি গ্রন্থ। আল-মুকাদ্দিমা। আর সেই গ্রন্থের লেখক আবু যায়দ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন। আজ তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রদূত, ইতিহাসচিন্তার এক বিপ্লবী নাম এবং অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাথমিক পথিকৃৎ হি...

মাঝে মাঝে

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন সীমান্ত সৈনিক কাঁটাতারের বেড়াজাল ছেঁড়া শত্রুর অপেক্ষামান মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন লাইটহাউজ সুউচ্চ মিনার হতে পথহারা নাবিকের আশারআলো; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন ক্রনোমিটার বিচ্ছেদের প্রহর শেষে ফিরে আসার সুচতুর অনুমান। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন পুরনো বই, ধুলোমলিন পড়ে রই টেবিলের এককোণে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন কবিতার খাতা ভুল ব্যাকরণে লেখা তাই পড়েনি কেউ; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন বৃষ্টি ভেজা রংধনু এক আকাশ মন খারাপ শেষে কারো মন ভালো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন অভিযোগকারী আকাশ পানে চেয়ে রবকে বলি রোজ ভুলতে চাই যন্ত্রনাদের