Skip to main content

উস্তাদ নোমান আলী খানের কুরআন ও বৈশ্বিক অর্থনীতি | পর্ব ০১


আমরা কুরআন খুললে সাধারণত কি খুঁজি?

ইবাদতের বিধান, আখিরাতের কথা, হালাল-হারাম, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। এসবই কুরআনের অপরিহার্য শিক্ষা। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি আমরা খুব কমই করি—কুরআন আমাদের জীবিকা, ব্যবসা, সম্পদ, উৎপাদন, ভোগ, বাণিজ্য কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে কী বলতে চায়?

উস্তাদ নোমান আলী খান তাঁর এই আলোচনায় ঠিক সেই জায়গাটিতেই নতুন করে তাকাতে বলেন।

তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্বস্তির কথা উঠে আসে। মুসলিম সমাজে অনেক সময় দ্বীন ও দুনিয়াকে এমনভাবে আলাদা করে দেখা হয়, যেন একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো সম্পর্ক নেই। কুরআন মানে নামাজ, রোজা, আখিরাত, মসজিদ ও আধ্যাত্মিকতা; আর ব্যবসা, ব্যাংকিং, ক্যারিয়ার, প্রযুক্তি, প্রকৌশল কিংবা অর্থনীতি যেন সম্পূর্ণ অন্য একটি জগতের বিষয়।

কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে জীবন এতটা খণ্ডিত নয়।

মানুষ কীভাবে উপার্জন করছে, কীভাবে সম্পদ ব্যবহার করছে, কীভাবে পৃথিবীর সম্পদকে কাজে লাগাচ্ছে, কীভাবে সমাজ গড়ে তুলছে—এসবও মানুষের জীবনের অংশ। আর মানুষের জীবনের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ নেই, যার প্রতি কুরআনের নৈতিক দৃষ্টি একেবারে অনুপস্থিত।

নোমান আলী খান তাই কুরআনকে শুধু একটি আধ্যাত্মিক গ্রন্থের সংকীর্ণ পাঠে আটকে না রেখে অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি দৃষ্টিকোণ থেকেও পড়ার আহ্বান জানান।


বৃষ্টির ফোঁটা থেকে বৈশ্বিক বাজার

অর্থনীতির কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রথমে আমাদের নিয়ে যান একেবারে প্রকৃতির কাছে।

কুরআন বারবার বৃষ্টির কথা বলে। মাটির কথা বলে। মাটি থেকে জন্ম নেওয়া শস্য, আঙুর, জলপাই, খেজুর, নানা ফল ও উদ্ভিদের কথা বলে। পশুর কথা বলে, যাদের থেকে মানুষ খাদ্য ও অন্যান্য উপকার পায়।

দেখতে এগুলো নিছক প্রকৃতির বর্ণনা। কিন্তু একটু অন্যভাবে তাকালে এগুলো একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি।

একটি বৃষ্টির ফোঁটা থেকে শুরু করে একটি খাবারের প্লেট পর্যন্ত আসতে কত মানুষ, কত প্রতিষ্ঠান, কত অবকাঠামো এবং কতগুলো অর্থনৈতিক কার্যক্রম জড়িয়ে থাকে!

বৃষ্টি হলো। ফসল জন্মাল। পশু সেই ফসল খেল। কৃষক উৎপাদন করল। কেউ সংগ্রহ করল, কেউ প্রক্রিয়াজাত করল, কেউ সংরক্ষণ করল, কেউ পরিবহন করল। এরপর সেটি বাজারে গেল, দোকানে গেল, শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরের টেবিলে পৌঁছাল।

অর্থাৎ একটি সাধারণ খাবারের পেছনেও রয়েছে একটি সম্পূর্ণ সাপ্লাই চেইন।

আর সেই কারণেই কোনো একটি দেশের যুদ্ধ, খরা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু সেই দেশের মানুষকেই প্রভাবিত করে না। খাদ্য উৎপাদনের একটি বড় অঞ্চল বিপর্যস্ত হলে তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে অন্য দেশেও। গমের সরবরাহ কমে গেলে রুটির দাম বাড়ে; পশুখাদ্যের দাম বাড়লে মাংস ও দুধের দামও বদলে যায়। একটি অঞ্চলের সংকট কখনো কখনো পুরো বিশ্বের বাজারে পৌঁছে যায়।

তাঁর আলোচনায় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের উদাহরণও আসে। কারণ খাদ্যশস্যের বড় উৎপাদন ও রপ্তানিকারক অঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব বহু দূরের বাজারেও পৌঁছে যেতে পারে।

এখানেই কুরআনের প্রকৃতি-বর্ণনাগুলোকে তিনি অর্থনীতির একটি বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে বলেন।


রিজিক শুধু আধ্যাত্মিক শব্দ নয়

এই আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো রিজিক।

রিজিক শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে সাধারণত আল্লাহর দেওয়া জীবিকা কিংবা অনুগ্রহের কথা আসে। সেটি অবশ্যই এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু নোমান আলী খান মনে করিয়ে দেন, রিজিককে শুধু একটি বিমূর্ত আধ্যাত্মিক ধারণা হিসেবে দেখলে কুরআনের অনেক বাস্তব দিক আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়।

আমাদের সামনে রাখা খাবারও রিজিক।

কিন্তু সেই খাবারটি আমাদের সামনে আসার আগে যে বিশাল ব্যবস্থা কাজ করেছে, সেটিও তো পৃথিবীর জীবিকা-ব্যবস্থার অংশ।

বৃষ্টি থেকে শস্য, শস্য থেকে পশুর খাদ্য, সেখান থেকে খাদ্য উৎপাদন, এরপর প্রক্রিয়াজাতকরণ, কারখানা, গুদাম, পরিবহন, বাজার—সবশেষে ভোক্তা।

অর্থাৎ রিজিক কেবল প্লেটে থাকা খাবারের নাম নয়; এর পেছনে থাকা পৃথিবীর একটি বিশাল উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ কারণেই কোনো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা কেবল কৃষকের বিষয় নয়। এর সঙ্গে পানি, পরিবহন, বন্দর, শিল্প, বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এমনকি জাতীয় নিরাপত্তাও জড়িয়ে থাকে।

তিনি মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্যনির্ভরতার উদাহরণও দেন। একটি দেশ যদি নিজের দুধ, মাংস কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের বড় অংশ বাইরে থেকে আনে, তাহলে যুদ্ধ বা আকাশপথ ও বাণিজ্যপথের সংকট তার দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি আঘাত করতে পারে।

রিজিক তখন আর কেবল ধর্মীয় শব্দ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে খাদ্যব্যবস্থা, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি বাস্তব প্রশ্ন।


‘ফাদল’: নামাজের পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া

কুরআনের আরেকটি শব্দ নিয়ে তিনি বিশেষভাবে কথা বলেন—ফাদল।

‘ফাদল’ অর্থ অনুগ্রহ, অতিরিক্ত দান, প্রাচুর্য বা বাড়তি কল্যাণ। অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে শব্দটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তিনি দেখতে পান।

সূরা আল-জুমু‘আহতে আল্লাহ বলেন:

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

“অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হয়, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো; আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পার।”

সূরা আল-জুমু‘আহ, ৬২:১০।

আয়াতটির একটি দৃশ্য যেন খুব স্পষ্টভাবে সামনে আসে।

নামাজ শেষ হলো। মানুষ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর আল্লাহর ফাদল অনুসন্ধান করল।

অর্থাৎ ইবাদত মানুষকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে না। বরং ইবাদতের পর মানুষ আবার জীবনের কাজে ফিরে যায়।

এই একই ধারণা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায় হজের প্রসঙ্গে। আল্লাহ বলেন:

لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّبِّكُمْ

“তোমাদের ওপর কোনো দোষ নেই যে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করবে।”

সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৮।

অর্থাৎ হজের মতো গভীর আধ্যাত্মিক সফরের মধ্যেও বৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে কুরআন স্বয়ং নিষিদ্ধ করেনি।

নোমান আলী খান এখানে একটি মজার, কিন্তু চিন্তার মতো তুলনা করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ যখন হজে একত্রিত হয়, তখন একই জায়গায় পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ, পেশা ও ব্যবসার প্রতিনিধিরা উপস্থিত হন। তাঁর ভাষায়, এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগগুলোর একটি হিসেবেও দেখা যায়।

এটি অবশ্য তাঁর একটি রসাত্মক অর্থনৈতিক উপমা। কিন্তু মূল বক্তব্যটি গভীর—আধ্যাত্মিকতা ও বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কুরআন পরস্পরের শত্রু হিসেবে দেখায় না।


সম্পদ কি তাহলে আধ্যাত্মিকতার বিপরীত?

মুসলিমদের মধ্যে কখনো কখনো এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে ভালো মুসলিম মানেই দুনিয়ার সম্পদ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা।

কিন্তু কুরআন প্রশ্ন তোলে:

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ

“বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য ও উত্তম রিজিক বের করেছেন, তা কে হারাম করেছে?”

সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৩২।

এখানে কুরআনের বক্তব্য সম্পদের পূজা করার অনুমতি নয়। বরং বৈধ ও পবিত্র নেয়ামতকে অকারণে ধর্মবিরোধী বানিয়ে ফেলার প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন।

সমস্যা সম্পদে নয়; সমস্যা সম্পদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে।

সম্পদ যদি অন্যায়, শোষণ, অহংকার ও হারামের পথে যায়, সেটি বিপজ্জনক। কিন্তু বৈধ উপার্জন, ব্যবসা, উৎপাদন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি কিংবা সম্পদ সৃষ্টি নিজেই আধ্যাত্মিকতার বিপরীত নয়।


পৃথিবী কি শুধু বেঁচে থাকার জায়গা?

নোমান আলী খানের আলোচনায় এখানেই আসে দুলকারনাইন।

সূরা আল-কাহফের দুলকারনাইনকে তিনি এমন একজন শাসক হিসেবে দেখান, যিনি আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্য ব্যবহার করে আরও সম্পদ, আরও জ্ঞান, আরও অঞ্চল ও আরও সম্ভাবনার সন্ধানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অগ্রসর হন।

এখানে তাঁর পাঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো reinvestment।

যে সম্পদ পাওয়া গেছে, সেটিকে শুধু ভোগ না করে আবার কাজে লাগানো। একটি সম্পদকে ব্যবহার করে আরও উৎপাদন, আরও উন্নয়ন এবং আরও মানুষের কল্যাণ সৃষ্টি করা।

অর্থনীতির ভাষায় এটি পুঁজি পুনঃবিনিয়োগের ধারণার সঙ্গে তুলনীয়।

কুরআনের দৃষ্টিতে পৃথিবী যেন এমন কোনো জায়গা নয় যেখানে মানুষ কেবল বসে থাকবে এবং পৃথিবীকে সন্দেহের চোখে দেখবে। পৃথিবীকে চিনতে হবে, এর সম্পদকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, নতুন জায়গায় যেতে হবে, জ্ঞান অর্জন করতে হবে, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে এবং উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

নূহ (আ.)-এর বক্তব্যের প্রসঙ্গেও তিনি একই ধরনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। কুরআনে এসেছে:

وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ بِسَاطًا ۝ لِّتَسْلُكُوا مِنْهَا سُبُلًا فِجَاجًا

“আর আল্লাহ তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন বিস্তৃত প্রান্তর, যাতে তোমরা তার প্রশস্ত পথে চলতে পারো।”

সূরা নূহ, ৭১:১৯–২০।

অর্থাৎ পৃথিবীকে জানার, চলার এবং এর বিস্তৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি ধারণা কুরআনের বর্ণনায়ও উপস্থিত।


‘মাতাআ’: শুধু ব্যবহার নয়, উপকার ও আনন্দ

এরপর বক্তা নিয়ে আসেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কুরআনিক শব্দ—মাতাআ (مَتَاع)।

শব্দটির মধ্যে উপকার, ব্যবহারযোগ্যতা এবং উপভোগের ধারণা রয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন প্রসঙ্গে শব্দটি এসেছে।

নোমান আলী খান এটিকে আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। একটি জিনিসের মূল্য শুধু তার অস্তিত্বে নয়; মানুষ সেটি দিয়ে কী উপকার পায় এবং সেটি ব্যবহারে কতটা সুবিধা বা আনন্দ পায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ফলের পুষ্টিগুণ আছে, আবার স্বাদও আছে।

একটি গাড়ি মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়, আবার তার নকশা, আরাম ও ব্যবহার-অভিজ্ঞতাও মানুষকে আকৃষ্ট করে।

একটি মোবাইল ফোনের ব্যবহারিক প্রয়োজন আছে, আবার তার নকশা, ক্যামেরা, সফটওয়্যার কিংবা ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাও ক্রেতার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

অর্থাৎ আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় utility এবং experience—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

কুরআনের মাতাআ শব্দের এই অর্থনৈতিক পাঠ বক্তার আলোচনাকে আধুনিক ব্যবসা ও প্রযুক্তির জগতের সঙ্গে যুক্ত করে।

তিনি সূরা নূরের ২৪:২৯ আয়াতও আলোচনায় আনেন:

لَّيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ مَسْكُونَةٍ فِيهَا مَتَاعٌ لَّكُمْ

“যেসব ঘর বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হয় না, তাতে তোমাদের কোনো প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকলে সেখানে প্রবেশ করায় তোমাদের কোনো দোষ নেই।”

আয়াতটির প্রথাগত তাফসিরে রাস্তার পাশে যাত্রীদের জন্য নির্মিত ঘর বা জনসাধারণের উপকারে ব্যবহৃত স্থানগুলোর কথাও এসেছে।

বক্তা এই ধারণাটিকে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে পড়েন—মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্মিত বাণিজ্যিক ও জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো, অফিস, প্রতিষ্ঠান, সেবা-ব্যবস্থা ইত্যাদির দিকে ইঙ্গিত হিসেবে।

এটি তাঁর অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার একটি সম্প্রসারণ, আয়াতটির একমাত্র বা সরাসরি তাফসির নয়। কিন্তু এই পাঠ আমাদের একটি প্রশ্ন করতে শেখায়—একটি সভ্যতা কতটা মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মতো অবকাঠামো তৈরি করেছে?


জ্ঞানকে কেন ‘দুনিয়া’ বলে দূরে সরিয়ে দেব?

আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি আসে যখন নোমান আলী খান মুসলিম সমাজের একটি মানসিকতার সমালোচনা করেন।

কোনো তরুণ যদি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায়, ব্যবসা করতে চায়, অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করতে চায়, প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে চায় কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চায়, তখন কখনো কখনো তাকে বোঝানো হয়—এসব তো ‘দুনিয়ার’ বিষয়।

যেন ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করাই একমাত্র অর্থপূর্ণ জ্ঞান, আর প্রকৌশল, অর্থনীতি, ব্যবসা কিংবা প্রযুক্তি কেবল পার্থিব জীবনের সুবিধা অর্জনের উপায়।

নোমান আলী খান এই বিভাজনকে সমস্যাজনক মনে করেন।

কারণ একটি মুসলিম সমাজের হাসপাতাল দরকার। সেতু দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় দরকার। প্রযুক্তি দরকার। কৃষিবিজ্ঞান দরকার। অর্থনীতিবিদ দরকার। উদ্যোক্তা দরকার। প্রকৌশলী দরকার। দক্ষ প্রশাসক দরকার।

এসব যদি কেউ নৈতিকতা ও আল্লাহর প্রতি দায়িত্ববোধের সঙ্গে করে, তাহলে সেগুলো কীভাবে মুসলিম জীবনের বাইরে হয়ে যায়?

সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন ‘দ্বীন’কে জীবনের একটি ছোট অংশে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং বাকি পৃথিবীকে ‘দুনিয়া’ বলে আলাদা করে ফেলা হয়।

অথচ কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত।


সমুদ্রপথ থেকে বিশ্ববাণিজ্য

কুরআন জাহাজের কথাও বলে। মানুষ কীভাবে সমুদ্র পাড়ি দেয়, কীভাবে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যায়, কীভাবে পৃথিবীর বিস্তৃত অঞ্চলকে সংযুক্ত করে—এসব দৃশ্য কুরআনের বর্ণনায় বারবার আসে।

আজকের পৃথিবীতে সমুদ্রপথ ছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্য কল্পনা করাই কঠিন। একটি দেশের উৎপাদিত পণ্য অন্য দেশের বাজারে পৌঁছাতে বন্দর, জাহাজ, গুদাম, রাস্তা, রেল, কাস্টমস এবং অসংখ্য মানুষের শ্রম প্রয়োজন।

অর্থাৎ একটি জাহাজ কেবল একটি যান নয়। এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চলমান অংশ।

নোমান আলী খান কুরআনের জাহাজ, নদী, পৃথিবীর পথে চলাচল এবং সম্পদ অনুসন্ধানের উল্লেখগুলোকে এই বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে বলেন।


দ্বীন থেকে দুনিয়াকে বিচ্ছিন্ন করলে কী হারায়?

শেষ পর্যন্ত এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অর্থনীতির নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির।

আমরা কি মনে করি আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল মসজিদের ভেতরে?

নাকি সেই সম্পর্ক আমাদের অফিসেও আছে?

আমরা যখন ব্যবসা করি, তখনও?

কাউকে বেতন দিই, তখনও?

কোনো পণ্য তৈরি করি, তখনও?

কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করি, তখনও?

কোনো কৃষকের উৎপাদিত খাদ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিই, তখনও?

কুরআনের এই পাঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইসলাম জীবনকে আলাদা আলাদা খোপে ভাগ করে না। নামাজের সময় আল্লাহ, ব্যবসার সময় অন্য কেউ—এমন কোনো দ্বৈত জীবন ইসলামের আদর্শ নয়।

বরং নামাজ মানুষকে শেখাবে কীভাবে ব্যবসা করতে হবে। তাকওয়া শেখাবে কীভাবে সম্পদ ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহর ভয় শেখাবে কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে। আর কুরআনের নৈতিকতা শেখাবে কীভাবে পৃথিবীকে উন্নত করতে হবে, কিন্তু সেই উন্নয়নের মালিকানা নিয়ে অহংকারী না হতে হবে।

এই অর্থে রিজিকের সন্ধানও একটি দায়িত্ব।

পৃথিবীর সম্পদ ব্যবহার করাও একটি আমানত।

জ্ঞান অর্জনও একটি দায়িত্ব।

আর উন্নয়নও হতে পারে ইবাদতের অংশ—যদি তার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও ফলাফলের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশের প্রতি আনুগত্য থাকে।

তাই কুরআনকে শুধু ‘আখিরাতের বই’ হিসেবে পড়লে তার একটি বিশাল দিক আমাদের অদেখাই থেকে যেতে পারে। এই কিতাব মানুষকে পরকালীন সাফল্যের পথ দেখায়, কিন্তু একই সঙ্গে পৃথিবীতে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে বাঁচতে হবে, সম্পদ ব্যবহার করতে হবে এবং একটি কার্যকর সমাজ গড়ে তুলতে হবে, তারও নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

সম্ভবত এখানেই এই আলোচনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা:

দ্বীন মানুষকে পৃথিবী থেকে পালাতে শেখায় না; বরং পৃথিবীর দায়িত্ব নিতে শেখায়।

আর সেই দায়িত্বের একটি অংশ হলো—রিজিক খোঁজা, জ্ঞান অর্জন করা, ব্যবসা করা, সম্পদ সৃষ্টি করা এবং সেই সম্পদকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো।

পরবর্তী পর্বে এই আলোচনা আরও এগোবে—ব্যবসায়িক মানসিকতা, উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা এবং সচেতন ভোগের দিকে। অর্থাৎ শুধু সম্পদ কীভাবে পাওয়া যায়, তা নয়; একজন মুসলিম কীভাবে সম্পদ সৃষ্টি করবে এবং কীভাবে তার ভোক্তা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর কুরআনের দৃষ্টিতে খোঁজা হবে।

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

ইবনে খালদুন: রাজদরবার থেকে সভ্যতার অন্তর্গত সূত্রের সন্ধানে

ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল একটি যুগের প্রতিনিধি নন। তাঁরা তাঁদের সময়কে পেরিয়ে ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেন। ইবনে খালদুন ছিলেন তেমনই একজন। তিনি রাজা ছিলেন না, কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ছিলেন না যুদ্ধজয়ী সেনাপতি। তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল বাহিনী। অথচ রাজদরবার, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাসন, কারাবাস এবং সভ্যতার উত্থান-পতন তাঁকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছিল, যা কোনো পাঠশালায় একা বসে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। তিনি মানুষকে দেখেছিলেন ক্ষমতার খুব কাছে থেকে। দেখেছিলেন কীভাবে একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কীভাবে সম্পদ জমা হয়। কীভাবে করের বোঝা বাড়তে বাড়তে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। কীভাবে বিলাসিতা একটি বিজয়ী জাতির চরিত্র বদলে দেয়। আর কীভাবে যে জনগোষ্ঠী একসময় সাম্রাজ্য গড়ে, কয়েক প্রজন্ম পর তারাই সেই সাম্রাজ্যের ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল ছিল একটি গ্রন্থ। আল-মুকাদ্দিমা। আর সেই গ্রন্থের লেখক আবু যায়দ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন। আজ তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রদূত, ইতিহাসচিন্তার এক বিপ্লবী নাম এবং অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাথমিক পথিকৃৎ হি...

মাঝে মাঝে

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন সীমান্ত সৈনিক কাঁটাতারের বেড়াজাল ছেঁড়া শত্রুর অপেক্ষামান মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন লাইটহাউজ সুউচ্চ মিনার হতে পথহারা নাবিকের আশারআলো; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন ক্রনোমিটার বিচ্ছেদের প্রহর শেষে ফিরে আসার সুচতুর অনুমান। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন পুরনো বই, ধুলোমলিন পড়ে রই টেবিলের এককোণে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন কবিতার খাতা ভুল ব্যাকরণে লেখা তাই পড়েনি কেউ; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন বৃষ্টি ভেজা রংধনু এক আকাশ মন খারাপ শেষে কারো মন ভালো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন অভিযোগকারী আকাশ পানে চেয়ে রবকে বলি রোজ ভুলতে চাই যন্ত্রনাদের