পাহাড় থেকে বাব আল-মান্দাব
হুথিদের উত্থানের অন্তরালে
পায়ের ধুলো মুছে ফেলার মতো বিলাসিতা নেই। পরনে সাধারণ পোশাক, হাতে পুরোনো অস্ত্র। সামনে এমন সব যুদ্ধজাহাজ, যাদের মূল্য কয়েকশ কোটি ডলার। একদিকে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক শক্তি, অন্যদিকে ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড় থেকে উঠে আসা এক আন্দোলন।
স্বাভাবিক হিসাব বলবে, এই লড়াইয়ের ফলাফল একতরফা হওয়ার কথা।
কিন্তু ইয়েমেনের গল্প সেই হিসাব মানেনি।
দুই দশক ধরে হুথিরা টিকে আছে। শুধু টিকে থাকেনি, ধীরে ধীরে নিজেদের প্রভাবের পরিধি বাড়িয়েছে। উত্তর ইয়েমেনের সাদা প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন আজ এমন এক আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার নাম উচ্চারিত হয় ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সৌদি আরব, ইরান, ইসরায়েল এবং লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আলোচনাতেও।
তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিক:
হুথিরা আসলে কারা?
তারা কি কেবল ইরানের একটি প্রক্সি শক্তি, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক হিসাব ও নিজস্ব লক্ষ্য নিয়ে চলা একটি ইয়েমেনি আন্দোলন, যারা সময়ের সঙ্গে ইরানের সঙ্গে গভীর সামরিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ে।
সাদা: পাহাড়, পরিচয় এবং হারানো ক্ষমতা
উত্তর ইয়েমেনের সাদা অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে জায়দি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। জায়দিবাদ শিয়া ইসলামের একটি স্বতন্ত্র ধারা। ইরানে প্রচলিত দ্বাদশ ইমামভিত্তিক শিয়াবাদের সঙ্গে এর গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। তাই হুথিদের জায়দি পরিচয়কে সরাসরি ইরানি শিয়াবাদের সঙ্গে এক করে দেখা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জায়দিরা ইয়েমেনের ইতিহাসে সবসময় প্রান্তিক ছিল না।
উত্তর ইয়েমেনে জায়দি ইমামদের দীর্ঘ শাসনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৬২ সালের সামরিক বিপ্লবের পর সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে। এরপর উত্তরাঞ্চলের বহু জায়দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়।
সানা শহরের চারপাশে যখন উন্নয়ন, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিস্তৃত হচ্ছিল, সাদা থেকে যাওয়া পাহাড়ি অঞ্চল অনেক বেশি পিছিয়ে ছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি পরিবর্তন।
১৯৯০-এর দশকে সৌদি আরব থেকে আসা সালাফি প্রচারকদের প্রভাব উত্তর ইয়েমেনের জায়দি অধ্যুষিত এলাকায় বাড়তে শুরু করে। জায়দি ধর্মীয় পরিচয়ের কিছু নেতা এটিকে শুধু ধর্মীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখেননি, বরং নিজেদের ঐতিহ্য ও সামাজিক অবস্থানের ওপর চাপ হিসেবেও দেখেছিলেন।
এই পরিবেশেই আবির্ভাব ঘটে হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির।
তিনি ছিলেন ধর্মীয় নেতা, আবার রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। প্রথমদিকে এটি ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের আন্দোলন। কিন্তু ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর তাঁর বক্তব্য আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ এবং ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর মার্কিন ঘনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে উত্তর ইয়েমেনে বিক্ষোভ শুরু হয়।
তারপর সংঘাত আর থামেনি।
একজন নেতার মৃত্যু, একটি আন্দোলনের জন্ম
২০০৪ সালে ইয়েমেনি সরকার হুসেইন আল-হুথির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। সেপ্টেম্বরে তিনি নিহত হন।
সরকারের হিসাব ছিল, আন্দোলনের নেতৃত্ব ভেঙে দিলে সমস্যাটিও শেষ হয়ে যাবে।
ঘটল ঠিক উল্টো।
হুসেইনের মৃত্যুর পর তাঁর নামই আন্দোলনের পরিচয়ে পরিণত হলো। তাঁর অনুসারীদের বলা শুরু হলো হুথি। নেতৃত্ব চলে গেল তাঁর ছোট ভাই আবদুল মালিক আল-হুথির হাতে, যিনি পরবর্তী দুই দশকে আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে থেকে যান।
২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ইয়েমেনি সরকার ও হুথিদের মধ্যে ছয় দফা যুদ্ধ হয়।
এই যুদ্ধগুলো হুথিদের জন্য শুধু সংঘর্ষ ছিল না। এগুলো হয়ে উঠেছিল এক ধরনের দীর্ঘ সামরিক শিক্ষা।
তারা শিখেছিল পাহাড়ি ভূখণ্ড ব্যবহার করতে। শিখেছিল বড় বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি শক্তির লড়াই এড়িয়ে টিকে থাকতে। শিখেছিল যে প্রতিটি যুদ্ধ জেতা জরুরি নয়, কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধ থেকে বেঁচে বের হওয়া জরুরি।
এই মানসিকতাই পরবর্তীতে তাদের যুদ্ধকৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়।
আর গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, এসব প্রাথমিক যুদ্ধের সময় ইরানের বড় ধরনের সামরিক সহায়তার সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। CFR-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও বলছে, হুথিদের ইরানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক গভীর হয় পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের দিকে।
অর্থাৎ হুথিদের জন্ম ইরানে হয়নি।
তাদের শিকড় ছিল ইয়েমেনে।
আরব বসন্ত এবং অসম্ভব এক জোট
২০১১ সালে আরব বসন্ত ইয়েমেনে পৌঁছালে আলি আবদুল্লাহ সালেহর ৩৩ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তাঁর জায়গায় ক্ষমতায় আসেন আবদ রাব্বু মনসুর হাদি।
কিন্তু নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেল একটি বিভক্ত সামরিক বাহিনী, দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং গভীর রাজনৈতিক সংকট।
হুথিরা এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখল।
সাদা থেকে তারা দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল। একের পর এক এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আসতে থাকে। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানার দিকে এগিয়ে যায়।
এখানেই গল্পে আসে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত চরিত্রটি।
আলি আবদুল্লাহ সালেহ।
যে সালেহ একসময় হুসেইন আল-হুথিকে হত্যা করেছিলেন। যে সরকারের অধীনে হুথিদের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধ হয়েছিল, সেই সাবেক প্রেসিডেন্টই এবার হুথিদের সঙ্গে হাত মেলালেন।
কারণ দুজনের শত্রু তখন এক।
সালেহ ক্ষমতা হারিয়েছিলেন এবং প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। হুথিরা চেয়েছিল রাজধানী।
এই স্বার্থের মিল তাদের এক টেবিলে বসিয়ে দিল।
সালেহর সঙ্গে থাকা সামরিক কর্মকর্তা, উপজাতীয় নেটওয়ার্ক এবং নিরাপত্তা কাঠামোর একটি অংশ হুথিদের অগ্রযাত্রাকে সহজ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা সানার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
আর রাজধানী দখলের সঙ্গে তাদের হাতে আসে শুধু ভূখণ্ড নয়।
এসে যায় রাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো, অস্ত্রের মজুত, সামরিক কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ।
একটি পাহাড়ি বিদ্রোহী আন্দোলন তখন আর শুধু পাহাড়ের আন্দোলন রইল না।
তারা রাষ্ট্রের ভেতর ঢুকে পড়েছে।
সৌদি আরব কেন যুদ্ধে নামল?
হুথিদের অগ্রযাত্রা যখন দক্ষিণের দিকে এগিয়ে যায় এবং ২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়, সৌদি আরব এটিকে নিজেদের সীমান্তের জন্য বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে।
২৬ মার্চ ২০১৫ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
হিসাবটা তখন সহজ মনে হতে পারে।
একদিকে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের উন্নত বিমানশক্তি।
অন্যদিকে দরিদ্র ইয়েমেনের পাহাড়ি যোদ্ধারা।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে অর্থ আর প্রযুক্তি সবসময় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপ নেয় না।
আকাশ থেকে বোমা ফেলা যায়।
কিন্তু পাহাড় দখল করে রাখা যায় না শুধু আকাশ থেকে।
সেখানেই হুথিদের পুরোনো অভিজ্ঞতা কাজে আসে।
তাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিপক্ষকে দ্রুত পরাজিত করা নয়।
টিকে থাকা।
কারণ বড় শক্তির জন্য যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়া একটি সমস্যা। ছোট শক্তির জন্য দীর্ঘ যুদ্ধ কখনো কখনো নিজেই একটি কৌশল হয়ে ওঠে।
যে জোট শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেল
হুথিদের উত্থানের আরেকটি নাটকীয় অধ্যায় আসে ২০১৭ সালে।
আলি আবদুল্লাহ সালেহ বুঝতে পারেন, তাঁর সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক আর আগের জায়গায় নেই। তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতার দিকে যেতে চাইলে হুথিদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত সালেহ নিহত হন হুথি বাহিনীর হাতে।
যে মানুষ একসময় হুথিদের রাজধানীর দরজা খুলে দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই রাজধানীর রাস্তাতেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
কিন্তু তাঁর পরিবারের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।
তাঁর ভাতিজা তারিক সালেহ পরবর্তীতে হুথিবিরোধী বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার হয়ে ওঠেন।
ইয়েমেনের যুদ্ধ তাই শুধু দুই পক্ষের যুদ্ধ ছিল না।
এটি ছিল বহু পক্ষের স্বার্থের সংঘাত।
সৌদি আরবের সমর্থিত গোষ্ঠী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থিত গোষ্ঠী, দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, হুথি, আল-কায়েদা এবং অন্যান্য স্থানীয় শক্তি, সবাই একই ভূখণ্ডে নিজেদের আলাদা লক্ষ্য নিয়ে লড়ছিল।
এই বিভক্তিই ইয়েমেনের যুদ্ধকে আরও জটিল করে তোলে।
ইরান: অস্ত্রের চেয়ে বড় একটি সম্পর্ক
এবার আসে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নটি।
হুথিরা কি ইরানের প্রক্সি?
এক কথায় উত্তর দিলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
হুথিদের শিকড় ইয়েমেনে। তাদের আন্দোলন ইরান তৈরি করেনি। তাদের নেতৃত্বও ইয়েমেনি। এমনকি তাদের ধর্মীয় পরিচয়ও ইরানের প্রচলিত দ্বাদশ ইমামভিত্তিক শিয়াবাদের সঙ্গে এক নয়।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে ইরান হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে ইরানের সহায়তার কথা বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সময়ের সঙ্গে সম্পর্কটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক বিশ্লেষক হুথিদের জন্য “proxy” শব্দটির বদলে “informal partner” বা অনানুষ্ঠানিক অংশীদার শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কারণ ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও হুথিদের নিজস্ব নেতৃত্ব, নিজস্ব স্থানীয় স্বার্থ এবং নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে।
এখানে পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান হুথিদের ক্ষমতা বাড়িয়েছে।
কিন্তু হুথিদের সৃষ্টি করেনি।
অস্ত্র নয়, সক্ষমতার নেটওয়ার্ক
ইরানের সহায়তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো শুধু তৈরি অস্ত্র সরবরাহ করা নয়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতার ওপর জোর বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর ফলে ইয়েমেনের ভেতরে ছোট আকারের উৎপাদন ও মেরামত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে।
এখানে কৌশলটি সহজভাবে বোঝা যায়।
একটি তৈরি অস্ত্র পাঠানো মানে একটি অস্ত্র দেওয়া।
কিন্তু কাউকে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার, মেরামত বা আংশিকভাবে উৎপাদন করার সক্ষমতা দেওয়া মানে তার হাতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবকাঠামো তুলে দেওয়া।
এই কারণেই হুথিদের সামরিক শক্তি নিয়ে আলোচনায় শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের সংখ্যা দেখলে পুরো ছবিটা দেখা হয় না।
দেখতে হয় সেই নেটওয়ার্কটাকেও, যা ক্ষয়ক্ষতির পর আবার সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
২০১৯: যখন ইয়েমেনের পাহাড় থেকে বিশ্বের তেলের বাজার কেঁপে উঠল
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
হুথিরা হামলার দায় স্বীকার করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব হামলার উৎস ও ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন দাবি তোলে, আর ইরান সরাসরি দায় অস্বীকার করে। বিষয়টি আজও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক।
এই ঘটনা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয়।
হুথিরা এখন আর শুধু ইয়েমেনের ভেতরের একটি বিদ্রোহী শক্তি নয়।
তাদের হাতে থাকা সক্ষমতা আঞ্চলিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাব আল-মান্দাব: পাহাড়ের আন্দোলন যখন সমুদ্রের দরজায়
ইয়েমেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সুবিধাগুলোর একটি হলো তার অবস্থান।
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে বাব আল-মান্দাব প্রণালি।
এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা শুধু ইয়েমেনের বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিদের লোহিত সাগরকেন্দ্রিক হামলা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এখানেই হুথিদের উত্থানের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি বোঝা যায়।
একসময় তারা সাদা পাহাড়ের ভেতর নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ছিল।
এখন তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে সমুদ্রপথে।
একটি স্থানীয় আন্দোলন আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হলে তার ভূগোলও বদলে যায়।
তাহলে হুথিদের আসল শক্তি কোথায়?
তাদের শক্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রে নয়।
শুধু ইরানের সহায়তাতেও নয়।
শুধু পাহাড়ি ভূগোলেও নয়।
বরং কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করেছে।
প্রথমত, স্থানীয় শিকড়।
হুথি আন্দোলনের জন্ম ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায়।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
২০০৪ থেকে ২০১০ সালের ছয়টি যুদ্ধ তাদের সংগঠন ও যুদ্ধকৌশলকে বদলে দেয়।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষমতা।
আরব বসন্ত, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা এবং সালেহর সঙ্গে অপ্রত্যাশিত জোট তাদের রাজধানীতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়।
চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় সম্পদের দখল।
সানা দখলের পর তারা ইয়েমেনের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
পঞ্চমত, ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।
এটি বিশেষ করে তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
আর সবশেষে রয়েছে এমন একটি কৌশল, যার ভিত্তি খুব পুরোনো:
পরাজিত না হওয়া।
হুথিদের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
হুথিদের উত্থানকে শুধু ইরানের গল্প হিসেবে দেখলে একটি অংশ বোঝা যায়।
শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি হিসেবে দেখলেও আরেকটি অংশ বাদ পড়ে যায়।
পুরো ছবিটা দেখতে হলে দুটোকে একসঙ্গে দেখতে হয়।
একটি স্থানীয় আন্দোলন কীভাবে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, পরিচয়ের রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা এবং ধারাবাহিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি সংগঠিত শক্তিতে পরিণত হলো, সেটি প্রথম গল্প।
আর দ্বিতীয় গল্প হলো, সেই শক্তি কীভাবে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ঢুকে ইরানের কাছ থেকে প্রযুক্তি, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের সামরিক সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়াল।
তাই হুথিদের সবচেয়ে যথাযথভাবে বোঝার জন্য হয়তো দুটি বাক্য পাশাপাশি রাখতে হয়:
ইরান ছাড়া আজকের হুথিদের সামরিক সক্ষমতা কল্পনা করা কঠিন।
কিন্তু
ইরান হুথি আন্দোলন সৃষ্টি করেনি।
এই দুই সত্যের মাঝখানেই রয়েছে হুথিদের প্রকৃত গল্প।
সাদা পাহাড়ের সেই আন্দোলন আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তাদের উপেক্ষা করে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে কথা বলা কঠিন।
একসময় তাদের পরিচয় ছিল কয়েক হাজার পাহাড়ি যোদ্ধার একটি আন্দোলন হিসেবে।
আজ প্রশ্নটা আর তারা কতজন যোদ্ধা নিয়ে পাহাড়ে আছে, সেটা নয়।
প্রশ্ন হলো, একটি স্থানীয় আন্দোলন কীভাবে এমন এক আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হলো, যার উপস্থিতি সমুদ্রপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য পর্যন্ত স্পর্শ করছে।
হুথিদের গল্প তাই কেবল যুদ্ধের গল্প নয়।
এটি রাষ্ট্রের দুর্বলতা, পরিচয়ের রাজনীতি, ভূগোল, দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার গল্প।
আর সেই কারণেই, পাহাড় থেকে শুরু হওয়া এই গল্পের শেষ সীমা আজ আর ইয়েমেনের পাহাড়ে আটকে নেই।

Comments
Post a Comment