Skip to main content

সালাহ আল-দীন ইউসুফ ইবন আইয়ুব


আল-কুদসের পথে দীর্ঘ যাত্রা

তাকরিতের এক নির্বাসিত পরিবার থেকে হিত্তিনের বিজয়, জেরুজালেমের পুনর্দখল এবং ইতিহাসের এক অমর নাম

ইতিহাসের কিছু চরিত্রকে শুধু তাদের বিজয়ের তালিকা দিয়ে বোঝা যায় না। তাদের বুঝতে হয় সেই সময়কে, যে সময় তাদের জন্ম দিয়েছিল; সেই সংকটকে, যার ভেতর দিয়ে তারা উঠে এসেছিল; এবং সেই সিদ্ধান্তগুলোকে, যা তাদের সমকালকে ছাড়িয়ে বহু শতাব্দী পরও স্মরণীয় করে রেখেছে।

সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবন আইয়ুব, ইতিহাসের কাছে যিনি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী নামে পরিচিত, তেমনই এক চরিত্র।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত অধ্যায় অবশ্যই ১১৮৭ সালের জেরুজালেম। ৮৮ বছর ক্রুসেডার শাসনের পর আল-কুদস আবার মুসলিম নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু সেই বিজয়ের গল্প শুরু হয়নি হিত্তিনের যুদ্ধক্ষেত্রে। শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে, উত্তর মেসোপটেমিয়ার এক পরিবারে, রাজনৈতিক অস্থিরতার এক যুগে।

আর সালাহউদ্দিনের গল্প বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় সেই সময়ে, যখন মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল বাইরের শত্রু নয়, বরং তার নিজের রাজনৈতিক বিভাজন।


যে পৃথিবীতে একটি শিশু জন্ম নিল

সালাহউদ্দিনের জন্ম আনুমানিক ১১৩৭ বা ১১৩৮ সালে তাকরিতে, বর্তমান ইরাকের ভূখণ্ডে। তাঁর পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব ছিলেন সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এক ব্যক্তি। আইয়ুব পরিবারের উত্থান ঘটছিল জঙ্গি শাসকদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে।

সালাহউদ্দিন জন্ম নেওয়ার সময় মুসলিম বিশ্ব ছিল এক অদ্ভুত বাস্তবতার মধ্যে।

একদিকে ছিল আব্বাসীয় খিলাফত, যার ধর্মীয় মর্যাদা ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত। অন্যদিকে সেলজুক শক্তি ভেঙে বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকের হাতে ছড়িয়ে পড়েছিল। মিসরে ফাতিমীয় শাসন তখন দুর্বলতার দিকে এগোচ্ছিল। আর সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলো শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে বসেছিল।

১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের পর জেরুজালেম ক্রুসেডারদের হাতে চলে যায়। এর আগে-পরে এ অঞ্চলে সংঘটিত যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড মুসলিম সমাজে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল।

কিন্তু এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময় পর সেই শহর পুনরুদ্ধারের জন্য যে মানুষটি ইতিহাসে উঠে আসবেন, তাঁর শৈশব তখনও শুরু হয়নি।


একটি জনপ্রিয় কাহিনি ও ঐতিহাসিক সত্য

সালাহউদ্দিনকে নিয়ে আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনপ্রিয় বর্ণনায় তাঁর বাবা-মায়ের বিয়ে নিয়ে একটি আবেগময় গল্প প্রচলিত আছে।

কাহিনিতে বলা হয়, নাজমুদ্দিন আইয়ুব এমন একজন নারীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন যিনি শুধু সম্পদ বা সৌন্দর্যের অধিকারী নন, বরং ধার্মিক ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন এক সন্তান, যে একদিন বীর সেনাপতি হবে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত করবে।

পরে সেই নারী নাকি একই ধরনের আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করেন।

তারপর জন্ম নেন ইউসুফ।

গল্পটি সুন্দর। এতটাই সুন্দর যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি সালাহউদ্দিনের জীবনের এক প্রতীকী ভূমিকা হিসেবে বলা হয়েছে। কিন্তু এর প্রাথমিক উৎস ও ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত জীবনীমূলক তথ্যের বদলে পরবর্তী ঐতিহ্যে প্রচলিত কাহিনি হিসেবে দেখা নিরাপদ।

নিশ্চিতভাবে যা জানা যায়, তা হলো, আইয়ুব পরিবার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকরিত ছেড়ে মসুলের দিকে চলে যায়।

একটি শহর হারানো হয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাস তখনও জানত না, এই পরিবার থেকেই এমন একজন মানুষ আসছেন, যিনি একদিন সেই হারানো শহরগুলোর চেয়েও অনেক বড় এক শহরের ভাগ্য বদলে দেবেন।


পরিবারের ছায়ায়

মসুলে আইয়ুব পরিবারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ইমাদুদ্দিন জঙ্গির রাজনৈতিক শক্তির।

জঙ্গি ছিলেন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিম প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক নেতাদের একজন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নূরুদ্দিন মাহমুদ জঙ্গি সেই সংগ্রামকে আরও বিস্তৃত করেন।

এখানেই সালাহউদ্দিনের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়।

তিনি এমন এক প্রজন্মের সন্তান, যারা বুঝতে শুরু করেছিল যে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে শুধু বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ করে সফল হওয়া যাবে না। দরকার ছিল রাজনৈতিক ঐক্য, প্রশাসনিক শক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি।

নূরুদ্দিনের অধীনে সালাহউদ্দিনের পরিবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক দায়িত্ব পেতে থাকে।

সালাহউদ্দিনের বাবা নাজমুদ্দিন আইয়ুব দামেস্কের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। তাঁর চাচা আসাদুদ্দিন শিরকুহ ছিলেন নূরুদ্দিনের অন্যতম প্রধান সামরিক কমান্ডার।

সালাহউদ্দিন তখন তরুণ।

তিনি ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন। পাশাপাশি ঘোড়সওয়ারি, অস্ত্রচালনা ও সামরিক জীবনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন।

কিন্তু ইতিহাস তাঁকে এখনো সেনাপতি হিসেবে চিনত না।


মিসর: ইউসুফ থেকে সালাহ আল-দীন

১২শ শতকের মাঝামাঝি মিসর ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভেতর থেকে দুর্বল।

সেখানে তখন ফাতিমীয় খিলাফতের শেষ সময় চলছে। দরবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং বাইরের হুমকি পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলেছিল।

এই পরিস্থিতিতে নূরুদ্দিন জঙ্গি মিসরে সামরিক অভিযান পাঠান।

সেনাপতি ছিলেন আসাদুদ্দিন শিরকুহ।

আর তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর তরুণ ভাতিজা ইউসুফ।

এই অভিযানে ইউসুফের সামরিক দক্ষতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

তিনি ছিলেন শান্ত, হিসাবি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দক্ষ। যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু সাহস নয়, কৌশলও প্রয়োজন। আর সালাহউদ্দিনের ভবিষ্যৎ সাফল্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল এই কৌশলগত চিন্তা।

শিরকুহ ১১৬৯ সালে মিসরের উজির হন। অল্প সময় পর তাঁর মৃত্যু ঘটে।

এরপর মিসরের উজিরের পদে বসেন তাঁর ভাতিজা ইউসুফ।

তিনি তখনো খুব তরুণ।

ইতিহাস তাঁকে এবার নতুন নামে চিনতে শুরু করল:

সালাহ আল-দীন।

অর্থাৎ, দ্বীনের কল্যাণ


ফাতিমীয়দের অবসান এবং নতুন অধ্যায়

১১৭১ সালে ফাতিমীয় খিলাফতের অবসান ঘটে।

সালাহউদ্দিন মিসরে সুন্নি আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। মিসর তখন তাঁর ক্ষমতার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

কিন্তু তাঁর সামনে সমস্যা ছিল আরও বড়।

মিসর একা যথেষ্ট নয়।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য সিরিয়ার শক্তির সঙ্গে মিসরকে যুক্ত করতে হবে।

আর এখানেই সালাহউদ্দিনের রাজনৈতিক দক্ষতা সামরিক দক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তিনি শুধু যুদ্ধ করতে চাননি।

তিনি একটি রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।


নূরুদ্দিনের মৃত্যু - ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

১১৭৪ সালে নূরুদ্দিন জঙ্গির মৃত্যু ঘটে।

তাঁর উত্তরসূরি ছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র। এর ফলে সিরিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়।

সালাহউদ্দিন দামেস্কের দিকে অগ্রসর হন এবং ধীরে ধীরে সিরিয়ার বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন।

এখানে তাঁর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদদের ব্যাখ্যা একরকম নয়।

কেউ তাঁকে নূরুদ্দিনের অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রকল্পের উত্তরসূরি হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে তাঁর ক্ষমতা বিস্তারের ঘটনাকে কেউ কেউ স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

তবে ফলাফল ছিল স্পষ্ট।

মিসর ও সিরিয়া একই শক্তির অধীনে চলে আসে।

আর এটাই ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংঘর্ষের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।


একটি লক্ষ্য: আল-কুদস

সালাহউদ্দিনের রাজনৈতিক প্রকল্পের কেন্দ্রে ধীরে ধীরে চলে আসে জেরুজালেম।

কিন্তু তিনি জানতেন, জেরুজালেম দখল করতে হলে প্রথমে মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমাতে হবে।

তাই তাঁর অভিযান শুধু ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ছিল না।

তিনি মিসর, সিরিয়া এবং পরে মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলকে নিজের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন।

১২শ শতকের শেষভাগে তাঁর শাসন মিসর থেকে সিরিয়া, উত্তর মেসোপটেমিয়া, হিজাজ ও ইয়েমেনের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

এটি ছিল সামরিক জয়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল।

একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা হয়েছিল।

এখন অপেক্ষা ছিল সেই যুদ্ধের, যা ইতিহাস বদলে দেবে।


মন্টগিসার্ড: সালাহউদ্দিনের পরাজয়

ইতিহাসের মহান বিজয়ীদের জীবনেও পরাজয় থাকে।

১১৭৭ সালে সালাহউদ্দিন জেরুজালেমের রাজ্য আক্রমণ করেন। কিন্তু মন্টগিসার্ডের যুদ্ধে তাঁর বাহিনী পরাজিত হয়।

ক্রুসেডার রাজা বাল্ডউইন চতুর্থ, যিনি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ছিলেন, সেই যুদ্ধে সালাহউদ্দিনের বাহিনীর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য বিজয় অর্জন করেন।

এই পরাজয় সালাহউদ্দিনের পরিকল্পনাকে থামিয়ে দেয়।

কিন্তু ভেঙে দেয়নি।

তিনি ফিরে গেলেন মিসরে।

সামরিক সংগঠন পুনর্গঠন করলেন।

অর্থ ও রসদ সংগ্রহ করলেন।

রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত করলেন।

তারপর অপেক্ষা করলেন।

প্রায় এক দশক পর সেই অপেক্ষার ফল দেখা গেল।


হিত্তিন: ১১৮৭

৩ জুলাই ১১৮৭।

গ্যালিলির কাছে হিত্তিনের শিং নামের দুটি আগ্নেয়গিরির পাহাড়ের আশপাশে মুখোমুখি হলো দুই বাহিনী।

একদিকে সালাহউদ্দিনের বিশাল সেনাবাহিনী।

অন্যদিকে জেরুজালেমের রাজা গাই অব লুসিগনান-এর নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনী।

সালাহউদ্দিনের কৌশল ছিল অত্যন্ত কার্যকর।

ক্রুসেডার বাহিনীকে পানির উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। গরম ও তৃষ্ণার মধ্যে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

যুদ্ধের শেষে ক্রুসেডার বাহিনী ভেঙে পড়ে।

গাই বন্দি হন।

আর বন্দিদের মধ্যে ছিলেন সেই ব্যক্তি, যার সঙ্গে সালাহউদ্দিনের ব্যক্তিগত শত্রুতা তৈরি হয়েছিল:

রেনাল্ড অব শাতিয়োঁ।

রেনাল্ড দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম কাফেলা আক্রমণ করেছিলেন এবং সালাহউদ্দিনের সঙ্গে করা যুদ্ধবিরতিও লঙ্ঘন করেছিলেন।

হিত্তিনের পর তাঁর ভাগ্য নির্ধারিত ছিল।

সালাহউদ্দিন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

তবে জনপ্রিয় বর্ণনায় প্রচলিত পানির পাত্রের ঘটনাটি বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই এটিকে নিশ্চিত, শব্দশব্দে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে না দেখে মধ্যযুগীয় বর্ণনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করাই বেশি সতর্ক পদ্ধতি।

হিত্তিনের সামরিক ফলাফল ছিল অবশ্য অত্যন্ত বাস্তব।

জেরুজালেমের প্রতিরক্ষা কার্যত ভেঙে পড়েছিল।

এবার সালাহউদ্দিনের সামনে সেই শহর, যার দিকে তাঁর রাজনৈতিক প্রকল্প এতদিন ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল।


৮৮ বছর পর

১১৮৭ সালের সেপ্টেম্বর।

সালাহউদ্দিনের বাহিনী জেরুজালেম অবরোধ করে।

শহরের প্রতিরক্ষাকারীরা বুঝতে পারছিল, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সম্ভাবনা সীমিত।

আলোচনা শুরু হয়।

শহর আত্মসমর্পণ করে।

তারিখটি ছিল ২ অক্টোবর ১১৮৭।

প্রায় ৮৮ বছর পর জেরুজালেম আবার মুসলিম শাসনের অধীনে আসে।

কিন্তু ইতিহাসে এই মুহূর্তটি শুধু বিজয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিজয়ের পর সালাহউদ্দিনের আচরণও।


প্রতিশোধ নয়

১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা যখন জেরুজালেম দখল করেছিল, শহরের মুসলিম ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।

১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন যখন শহরে প্রবেশ করলেন, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়।

জেরুজালেমের বাসিন্দাদের অনেককে মুক্তিপণ দিয়ে শহর ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যারা মুক্তিপণ দিতে পারেনি, তাদের মধ্যেও অনেকে সালাহউদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের অর্থে মুক্তি পায়।

সবাই একই ভাগ্য পেয়েছিল এমন নয়। দাসত্ব ও মুক্তিপণের বাস্তবতাও ছিল। মধ্যযুগীয় যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা থেকে জেরুজালেম পুরোপুরি মুক্ত ছিল না।

তবু ১০৯৯ সালের গণহত্যার সঙ্গে ১১৮৭ সালের আত্মসমর্পণের আচরণের পার্থক্য ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

নারী ও শিশুদের প্রতিও তাঁর নীতির বর্ণনা পরবর্তী মুসলিম ও খ্রিস্টীয় উভয় ঐতিহ্যে এসেছে।

এই কারণেই সালাহউদ্দিনের কিংবদন্তি শুধু একজন বিজেতার কিংবদন্তি হয়ে থাকেনি।

তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন বিজয়ী, যিনি বিজয়ের পর কী করেছিলেন, সেই প্রশ্নেরও প্রতীক।


আল-আকসায় নূরুদ্দিনের মিম্বার

জেরুজালেমে প্রবেশের পর আল-আকসা মসজিদ পরিষ্কার করা হয়।

মুসলিম ইবাদতের জন্য স্থানটি পুনরায় প্রস্তুত করা হয়।

আর তারপর সেখানে স্থাপন করা হয় সেই বিখ্যাত মিম্বার, যা নূরুদ্দিন জঙ্গি বহু বছর আগে নির্মাণ করিয়েছিলেন।

নূরুদ্দিনের স্বপ্ন ছিল, একদিন এটি আল-আকসায় স্থাপন করা হবে।

তিনি সেই দিনটি দেখতে পাননি।

সালাহউদ্দিন দেখেছিলেন।

এ যেন এক প্রজন্মের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন অন্য প্রজন্ম এসে পূর্ণ করার দৃশ্য।


তৃতীয় ক্রুসেড: ইউরোপের রাজারা আবার এলেন

জেরুজালেমের পতনের সংবাদ ইউরোপে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

শুরু হয় তৃতীয় ক্রুসেড।

এবার ইউরোপের নেতৃত্বে ছিলেন কয়েকজন শক্তিশালী শাসক।

ইংল্যান্ডের রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট।

ফ্রান্সের ফিলিপ দ্বিতীয়।

আর পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট ফ্রেডরিক বারবারোসা।

এটি আর কোনো সাধারণ সামরিক অভিযান ছিল না।

ইউরোপের রাজারা নিজেরাই এতে যুক্ত হয়েছিলেন।

যুদ্ধ শুরু হয়।

আক্কা অবরোধ করা হয়।

উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ চলে।

সালাহউদ্দিনের বাহিনীও কঠিন চাপের মধ্যে পড়ে।

কিন্তু রিচার্ডের মতো অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও সালাহউদ্দিন জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন।


রিচার্ড বনাম সালাহউদ্দিন

রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট এবং সালাহউদ্দিনের নাম ইতিহাসে প্রায় পাশাপাশি উচ্চারিত হয়।

তাঁরা কখনো মুখোমুখি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হননি, কিন্তু তাঁদের বাহিনী বারবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

একজন ছিলেন ইউরোপীয় ক্রুসেডের অন্যতম প্রধান সামরিক নেতা।

অন্যজন ছিলেন জেরুজালেমের রক্ষক।

তাঁদের মধ্যে যুদ্ধ যেমন ছিল, তেমনই ছিল কূটনীতি।

শেষ পর্যন্ত ১১৯২ সালে একটি চুক্তি হয়।

জেরুজালেম মুসলিম নিয়ন্ত্রণে থাকে।

খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের শহর ও পবিত্র স্থানগুলোতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়।

রিচার্ড ফিরে যান ইউরোপে।

জেরুজালেম তাঁর হাতে আসেনি।

কিন্তু সালাহউদ্দিনও এই দীর্ঘ যুদ্ধের পর আর আগের অবস্থায় ছিলেন না।


শেষ যাত্রা

সালাহউদ্দিন দামেস্কে ফিরে আসেন।

শরীর তখন ক্লান্ত।

বছরের পর বছর যুদ্ধ, প্রশাসন, কূটনীতি এবং সামরিক অভিযানের চাপ তাঁর ওপর ছিল।

৪ মার্চ ১১৯৩ সালে দামেস্কে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫৫ বছর।

তিনি যে সাম্রাজ্য রেখে গিয়েছিলেন, তা তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি।

আইয়ুবীয় রাজবংশ আরও কয়েক দশক টিকে ছিল, কিন্তু সালাহউদ্দিনের মতো কেন্দ্রীভূত শক্তি আর ফিরে আসেনি।

তবু তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো সাম্রাজ্যের মানচিত্র ছিল না।

ছিল একটি শহর।

জেরুজালেম।


সাম্রাজ্য হারিয়ে গেল, কিংবদন্তি রয়ে গেল

সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

রাজনৈতিক শক্তি ক্ষয় হয়।

নতুন রাজবংশ আসে।

পুরোনো রাজবংশ চলে যায়।

কিন্তু সালাহউদ্দিনের নাম থেকে যায়।

কারণ তিনি শুধু একটি যুদ্ধ জেতেননি।

তিনি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন, যার প্রতীকী শক্তি শতাব্দী পেরিয়েও অটুট ছিল।

জেরুজালেম মুসলিম বিশ্বের কাছে শুধু একটি শহর নয়।

এটি ধর্মীয় স্মৃতি, ইতিহাস এবং পরিচয়ের একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক।

তাই আল-কুদসের কথা উঠলেই সালাহউদ্দিনের নাম ফিরে আসে।


কিংবদন্তির দ্বিতীয় জীবন

ইতিহাসে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু দিয়ে তাঁর প্রভাব শেষ হয় না।

কখনো কখনো তখনই শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় জীবন।

সালাহউদ্দিনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিভিন্ন মুসলিম শাসক নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পকে তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

বিশ শতকে মিসরের গামাল আবদেল নাসের-এর সঙ্গে সালাহউদ্দিনের তুলনা করা হয়েছিল। নাসেরের সময় ১৯৬৩ সালে সালাহউদ্দিনকে কেন্দ্র করে Al-Nasser Salah al-Din চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়।

ইরাকের সাদ্দাম হুসাইনও নিজের জন্মস্থান তাকরিতের সঙ্গে সালাহউদ্দিনের জন্মস্থানকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করেছিলেন।

এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।

কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উত্তরাধিকার আর তাঁর নিজের হাতে থাকে না।

পরবর্তী প্রজন্ম তাকে নিজেদের ভাষায় ব্যাখ্যা করে।

কেউ তাঁকে সেনাপতি হিসেবে দেখে।

কেউ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।

কেউ ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে।

কেউ আল-কুদসের মুক্তিদাতা হিসেবে।

আবার রাজনৈতিক নেতারাও কখনো কখনো তাঁর নাম ব্যবহার করেছেন নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য।

কিন্তু সালাহউদ্দিনের নিজের সময়কে বুঝতে হলে এই পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবহারের বাইরে গিয়ে তাঁকে দেখতে হয়।


শেষ দৃশ্য: একজন মানুষ, একটি শহর, কিছু স্মৃতি

সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই।

তিনি একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছিলেন, কিন্তু সেই সাম্রাজ্য স্থায়ী হয়নি।

তিনি বহু যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর স্মৃতি শুধু যুদ্ধের জন্য টিকে নেই।

তিনি জেরুজালেম দখল করেছিলেন, কিন্তু তাঁর কিংবদন্তির কেন্দ্রে শুধু বিজয় নয়, বিজয়ের পর তাঁর আচরণও রয়েছে।

তিনি ১১৯৩ সালে মারা গিয়েছিলেন।

দামেস্কের মাটিতে তাঁর কবর হয়েছে।

আইয়ুবীয় সাম্রাজ্য বহু আগেই ইতিহাসের পাতায় পরিণত হয়েছে।

কিন্তু জেরুজালেমের নাম উচ্চারিত হলেই তাঁর নাম আবার ফিরে আসে।

কারণ ইতিহাসে কিছু মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময়ের সন্তান হলেও, তাদের প্রতীকী অর্থ সময়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

সালাহউদ্দিন তাঁদেরই একজন।

তাকরিতের সেই শিশু একদিন পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরের ভাগ্য বদলে দিয়েছিলেন।

তারপর চলে গেছেন।

কিন্তু রেখে গেছেন একটি প্রশ্ন, যা ইতিহাসের পাতা থেকে বারবার ফিরে আসে:

একজন বিজেতার প্রকৃত পরিচয় কি সে কতটা ভূমি জয় করেছে, নাকি জয়ের পর সে পরাজিতের সঙ্গে কী আচরণ করেছে?

সালাহউদ্দিনের উত্তরটি তাঁর জীবনের ঘটনাগুলোর মধ্যেই ছড়িয়ে আছে।

আর তাই, শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁর নাম শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়।

তিনি আল-কুদসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ স্মৃতি।

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

ইবনে খালদুন: রাজদরবার থেকে সভ্যতার অন্তর্গত সূত্রের সন্ধানে

ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল একটি যুগের প্রতিনিধি নন। তাঁরা তাঁদের সময়কে পেরিয়ে ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেন। ইবনে খালদুন ছিলেন তেমনই একজন। তিনি রাজা ছিলেন না, কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ছিলেন না যুদ্ধজয়ী সেনাপতি। তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল বাহিনী। অথচ রাজদরবার, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাসন, কারাবাস এবং সভ্যতার উত্থান-পতন তাঁকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছিল, যা কোনো পাঠশালায় একা বসে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। তিনি মানুষকে দেখেছিলেন ক্ষমতার খুব কাছে থেকে। দেখেছিলেন কীভাবে একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কীভাবে সম্পদ জমা হয়। কীভাবে করের বোঝা বাড়তে বাড়তে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। কীভাবে বিলাসিতা একটি বিজয়ী জাতির চরিত্র বদলে দেয়। আর কীভাবে যে জনগোষ্ঠী একসময় সাম্রাজ্য গড়ে, কয়েক প্রজন্ম পর তারাই সেই সাম্রাজ্যের ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল ছিল একটি গ্রন্থ। আল-মুকাদ্দিমা। আর সেই গ্রন্থের লেখক আবু যায়দ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন। আজ তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রদূত, ইতিহাসচিন্তার এক বিপ্লবী নাম এবং অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাথমিক পথিকৃৎ হি...

মাঝে মাঝে

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন সীমান্ত সৈনিক কাঁটাতারের বেড়াজাল ছেঁড়া শত্রুর অপেক্ষামান মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন লাইটহাউজ সুউচ্চ মিনার হতে পথহারা নাবিকের আশারআলো; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন ক্রনোমিটার বিচ্ছেদের প্রহর শেষে ফিরে আসার সুচতুর অনুমান। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন পুরনো বই, ধুলোমলিন পড়ে রই টেবিলের এককোণে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন কবিতার খাতা ভুল ব্যাকরণে লেখা তাই পড়েনি কেউ; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন বৃষ্টি ভেজা রংধনু এক আকাশ মন খারাপ শেষে কারো মন ভালো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন অভিযোগকারী আকাশ পানে চেয়ে রবকে বলি রোজ ভুলতে চাই যন্ত্রনাদের