ইকবাল: আত্মবিস্মৃত এক জাতির দরজায় কড়া নাড়া কবি
হাতে হুক্কার নল। চারপাশে ঘরের মানুষ যার যার কাজে ব্যস্ত। অথচ সেই মানুষটির মন পড়ে আছে অন্য কোথাও।
ধোঁয়ার সরু রেখা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর তার চোখ যেন সেই ধোঁয়ার ভেতরেই কোনো অদৃশ্য দৃশ্য খুঁজে ফিরছে।
কী অপূর্ব সেই মুহূর্ত, যখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন, এখানেই আমার সীমা। এর পরের পথে আমার ডানা পুড়ে যাবে। এরপর?
মানুষটি ভাবছেন, সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর প্রিয় বান্দার মধ্যে সেই মহামুহূর্তে কী কথা হয়েছিল?
কিন্তু এই চিন্তা বেশিক্ষণ আধ্যাত্মিক কল্পনার মধ্যে আটকে থাকে না। তাঁর মন ফিরে আসে পৃথিবীতে। ফিরে আসে তাঁর নিজের জাতির কাছে।
একটি জাতি, যে একসময় পৃথিবীর ইতিহাসে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিল, আজ কেন এত ক্লান্ত? কেন এত বিভক্ত? কেন জ্ঞান থেকে দূরে? কেন আত্মবিশ্বাসহীন?
তাঁর বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে।
তিনি চান, কেউ যেন মুসলমানদের ওপর নেমে থাকা অলসতা ও আত্মবিস্মৃতির চাদরটি টেনে ছিঁড়ে ফেলে। সেই চাদর, যার নিচে চাপা পড়ে আছে এক জাতির সাহস, আত্মমর্যাদা ও সৃষ্টিশীলতার স্মৃতি।
হুক্কার ধোঁয়া ধীরে ধীরে একটি মানচিত্রের মতো আকার নেয়।
আর সেই মানচিত্র যেন একদিন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে রূপ নেয়।
এই মানুষটির নাম মুহাম্মদ ইকবাল।
আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল।
কিন্তু তাঁকে শুধু ‘পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা’ বললে তাঁর গল্পের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তিনি একই সঙ্গে কবি, দার্শনিক, চিন্তক, শিক্ষক, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানী এবং নিজের সময়ের মুসলিম সমাজ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন একজন মানুষ।
তাঁর জীবন ছিল একাধিক স্রোতের মিলনস্থল।
কখনো তিনি গভীর ধর্মানুভূতিতে কাঁদছেন, কখনো পাশ্চাত্য দর্শনের কঠিন প্রশ্নের সঙ্গে লড়ছেন, কখনো মুসলমানদের আত্মবিস্মৃতির বিরুদ্ধে কবিতা লিখছেন, আবার কখনো ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্ক ও অনুভূতির জটিলতার মধ্যেও আটকে পড়ছেন।
এই বৈপরীত্যগুলোই হয়তো ইকবালকে এত মানবিক করে তোলে।
শিকড়
১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর শিয়ালকোটে জন্ম নেন মুহাম্মদ ইকবাল।
তাঁর পিতা শেখ নূর মুহাম্মদ ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। ছেলের মধ্যে তিনি শুধু একজন শিক্ষিত মানুষকে দেখতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর ছেলে ইসলামকে বুঝুক, জ্ঞান অর্জন করুক এবং মানুষের কাজে আসুক।
ইকবালের শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলোর একজন ছিলেন সৈয়দ মীর হাসান।
মীর হাসান তাঁর মেধা খুব তাড়াতাড়ি চিনে ফেলেছিলেন। আর ইকবালের মধ্যেও ছিল শেখার এক অদ্ভুত ক্ষুধা।
আরবি, ফারসি, উর্দু, দর্শন, সাহিত্য, ধর্মীয় জ্ঞান, পরে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য চিন্তা, সবকিছুর প্রতিই তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে।
শৈশবের একটি ছোট ঘটনা তাঁর স্বভাবের একটি দিকও যেন প্রকাশ করে।
উস্তাদ নে এক দিন ইমলা লিখওয়া কর কহা, “লিখো গলত।”
ইকবাল নে ‘তোয়ে’ কো বদল কে ‘তে’ সে লিখা।
উস্তাদ নে পুছা, “ইয়ে কেয়া লিখা?”
ইকবাল নে কহা, “আপ নে গলত লিখনে কো কহা থা, ইস লিয়ে ম্যায়নে গলত হি লিখা।”
ইকবাল শব্দটির বানান এমনভাবে লিখলেন, যা ভুল।
ছোট্ট ইকবালের এই রসবোধের মধ্যে হয়তো পরবর্তী ইকবালের একটি বৈশিষ্ট্যও লুকিয়ে ছিল। তিনি কথাকে শুধু গ্রহণ করতেন না, তার ভেতরের অর্থ নিয়ে খেলতেন।
কবির জন্ম
যৌবনে পা রাখার আগেই তাঁর মধ্যে কবিতার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল।
কিন্তু তিনি শুধু কবি হতে চাননি। কবিতা তাঁর কাছে ক্রমে হয়ে উঠল চিন্তার ভাষা।
লাহোরে এসে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ আরও বিস্তৃত হলো। গভর্নমেন্ট কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেন। দর্শন, আরবি ও ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর হলো।
তাঁর কবিতার খ্যাতিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
একসময় লাহোরের একটি বড় মুশায়রায় তাঁকে কবিতা পড়ার জন্য ডাকা হলো।
মঞ্চে উঠে তিনি যখন আবৃত্তি শুরু করলেন, শ্রোতারা বুঝতে পারলেন, নতুন একজন কণ্ঠ এসে গেছে।
এ কণ্ঠ শুধু প্রেমের কথা বলবে না।
এ কণ্ঠ মানুষের আত্মা, সমাজ, ইতিহাস, ধর্ম, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলবে।
ইকবালের কবিতা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা ছাড়িয়ে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভাষা হয়ে উঠল।
তাঁর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: মুসলমান কোথায়?
ইকবালের সময়ের ভারতীয় মুসলমান সমাজ ছিল নানা সংকটে জর্জরিত।
ঔপনিবেশিক শাসন, শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
তিনি দেখছিলেন, মুসলমানেরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে কম ভাবছে।
বংশ, জাত, উপাধি, সম্প্রদায়, আঞ্চলিক পরিচয় সবকিছু সামনে চলে এসেছে।
কিন্তু বৃহত্তর মুসলিম পরিচয় কোথায়?
তাই তাঁর প্রশ্ন ছিল:
“তোমরা সবই তো, কিন্তু বলো তো, মুসলমানও কি?”
এই প্রশ্নের মধ্যে অপমানের চেয়ে জাগরণের আহ্বান বেশি ছিল।
ইকবাল মুসলমানদের অতীত স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শুধু অতীতে ফিরিয়ে নিতে চাননি। তাঁর কাছে ইতিহাস ছিল ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য আত্মবিশ্বাসের উৎস।
তিনি নীলনদের তীর থেকে কাশগর পর্যন্ত মুসলমানদের একটি বৃহত্তর ঐক্যের কল্পনা করতেন।
কাবুলে যদি কোনো মুসলমানের গায়ে কাঁটা ফুটে, হিন্দুস্তানের মুসলমানেরও যেন তার ব্যথা অনুভূত হয়।
এ ছিল তাঁর উম্মাহ-চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কর্ডোবার মসজিদে দাঁড়িয়ে
ইউরোপে যাওয়ার আগে কিংবা পরে নয়, ইকবালের চিন্তার জগতে ইউরোপ নিজেই একটি বড় আয়না হয়ে উঠেছিল।
তিনি পশ্চিমকে শুধু ঘৃণা করেননি।
বরং পশ্চিমের জ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান ও সংগঠনকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন।
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জ্ঞান ও প্রযুক্তির এত অগ্রগতি যদি মানুষের আত্মাকে শূন্য করে দেয়, তবে সেই অগ্রগতির অর্থ কী?
স্পেনের কর্ডোবার মসজিদ তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
একসময় মুসলিম সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র ছিল যে আন্দালুস, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি ইতিহাসের উত্থান ও পতনকে একই সঙ্গে অনুভব করেছিলেন।
একদিকে মুসলিম সভ্যতার জ্ঞান, শিল্প, দর্শন ও শক্তির স্মৃতি।
অন্যদিকে সেই সভ্যতার পতনের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ।
ইকবালের কাছে ইতিহাস তাই শুধু গৌরবের গল্প ছিল না।
ইতিহাস ছিল সতর্কবার্তাও।
ইউরোপে ইকবাল
১৯০৫ সালে ইকবাল উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপে যান।
প্রথমে ইংল্যান্ডে আইন অধ্যয়ন করেন। পরে জার্মানিতে গিয়ে দর্শন নিয়ে গবেষণা করেন এবং মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অর্জন করেন।
এই সময় তাঁর চিন্তায় একটি বড় পরিবর্তন আসে।
পশ্চিমা দর্শনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি পরিচয় হয়। নীটশে, বার্গসঁসহ বিভিন্ন পাশ্চাত্য চিন্তকের ভাবনা তিনি গভীরভাবে পড়েন।
কিন্তু তিনি অন্ধভাবে পশ্চিমকে গ্রহণ করেননি।
বরং পশ্চিমের শক্তির জায়গাগুলো বুঝতে গিয়ে তার সীমাবদ্ধতাও খুঁজে দেখেছেন।
তিনি দেখলেন, মানুষ প্রকৃতিকে জয় করছে, যন্ত্র তৈরি করছে, রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে সংগঠিত করছে, কিন্তু মানুষের অন্তর্গত জগতের প্রশ্নটি সেখানে অনেক সময় পিছিয়ে যাচ্ছে।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর নিজের চিন্তাকে আরও তীক্ষ্ণ করে।
ইকবাল বুঝতে শুরু করেন, মুসলিম সমাজের প্রয়োজন শুধু পশ্চিমা প্রযুক্তি গ্রহণ করা নয়।
প্রয়োজন এমন একটি পুনর্জাগরণ, যেখানে জ্ঞান ও ঈমান, বুদ্ধি ও আত্মা, কর্ম ও আধ্যাত্মিকতা পরস্পরের শত্রু হবে না।
আর সেই সময়েই এসেছিল ভালোবাসা
ইকবালকে শুধু একজন গুরুগম্ভীর দার্শনিক হিসেবে দেখলে তাঁর মানুষটিকে বোঝা যায় না।
তাঁর জীবনেও ছিল ভালোবাসা, আকর্ষণ, সম্পর্ক, দ্বিধা এবং ব্যক্তিগত টানাপোড়েন।
হাইডেলবার্গে তাঁর পরিচয় হয় জার্মান তরুণী এমা ওয়েগেনাস্টের সঙ্গে।
নেকার নদীর তীরে কাটানো সময় ইকবালের স্মৃতিতে বিশেষ জায়গা করে নেয়।
দেশে ফিরে এসেও তিনি তাঁকে ভুলতে পারেননি। তাঁর চিঠিপত্রে সেই আবেগের প্রতিফলন পাওয়া যায়।
এখানে ইকবাল আর সেই কঠিন দার্শনিক নন।
তিনি একজন মানুষ।
যিনি কাউকে মনে রেখেছেন।
যিনি দূরত্বের মধ্যেও একটি সুন্দর সময়কে আবার ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন।
একই সময়ে আতিয়া ফয়জির সঙ্গেও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগের কথা জীবনীকারেরা উল্লেখ করেছেন।
তবে এসব সম্পর্কের নানা ব্যাখ্যা আছে, এবং পরবর্তী জীবনী ও স্মৃতিচারণে সব বিবরণ একইভাবে উপস্থাপিত হয়নি।
ইকবালের ব্যক্তিজীবন তাই তাঁর দর্শনের মতোই সরল রেখায় আঁকা যায় না।
ফিরে এসে আরও গভীর ইকবাল
ইউরোপ থেকে ফিরে ইকবাল যেন নিজের ভেতরের মানুষটিকে আরও পরিষ্কারভাবে চিনতে শুরু করলেন।
ধর্মের প্রতি তাঁর টান আরও গভীর হলো।
কুরআন পড়তে গিয়ে তাঁর চোখে পানি আসত। ইসলামের ইতিহাস, কুরআন ও হাদিস নিয়ে তাঁর অধ্যয়ন ছিল বিস্তৃত।
কিন্তু তাঁর ধর্মচিন্তা ছিল নিছক আবেগনির্ভর নয়।
তিনি প্রশ্ন করতেন।
ভাবতেন।
তর্ক করতেন।
কখনো এমন ভাষায় আল্লাহর সঙ্গে কথা বলতেন, যা সমকালীন অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতো।
তিনি লিখলেন:
“খুদির” কথা।
আত্মসত্তার কথা।
মানুষের নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলার কথা।
ইকবালের ‘খুদি’ অহংকারের শিক্ষা নয়। তাঁর দর্শনে এটি মানুষের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা, দায়িত্ববোধ এবং সৃষ্টিশীল শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি এমন মানুষ চেয়েছিলেন, যে ভাগ্যের নামে বসে থাকবে না।
যে নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করার জন্য কাজ করবে।
যে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, কিন্তু নিজের দায়িত্ব থেকে পালাবে না।
শাহীন
ইকবালের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি হলো শাহীন।
শাহীন তাঁর কাছে শুধু একটি পাখি নয়।
এটি স্বাধীনতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আত্মনির্ভরতা এবং উচ্চতর লক্ষ্যকে ধারণ করা মানুষের প্রতীক।
শাহীন নিচুতে পড়ে থাকা জীবনের সঙ্গে সন্তুষ্ট নয়।
সে উঁচুতে উড়ে।
ঝুঁকি নেয়।
নিজের শক্তিতে বাঁচে।
ইকবাল চেয়েছিলেন মুসলিম যুবকও এমন হোক।
তার চোখে বড় স্বপ্ন থাকবে।
তার ভেতরে আত্মমর্যাদা থাকবে।
তার জীবন হবে কর্মমুখী।
এ কারণেই তাঁর কবিতা শুধু ধর্মীয় আবেগ তৈরি করার জন্য লেখা হয়নি। অনেক সময় তা ছিল চরিত্র নির্মাণের আহ্বান।
যে কবি রাজনীতির দিকে এগিয়ে গেলেন
ইকবালের চিন্তার আরেকটি বড় পরিবর্তন ছিল রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক।
ভারতের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চিন্তায় রূপ নেয়।
তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
১৯৩০ সালে তাঁর বিখ্যাত আলাহাবাদ ভাষণ এই চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
সেখানে তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে একটি পৃথক রাজনৈতিক একক হিসেবে সংগঠিত করার ধারণা প্রকাশ করেন।
পরবর্তীকালে এই বক্তব্যকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্বসূরি হিসেবে দেখা হয়েছে।
তবে এটিও মনে রাখা দরকার, ১৯৩০ সালের ইকবালের প্রস্তাবকে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে হুবহু এক করে দেখা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।
রাষ্ট্রের ধারণাটি পরবর্তী বছরগুলোতে আরও নানা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়।
তবু ইকবালের চিন্তার গুরুত্ব এখানেই যে তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নটিকে একটি সুস্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।
জিন্নাহর সঙ্গে সম্পর্ক
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে ইকবালের সম্পর্কও এই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইকবাল জিন্নাহকে মুসলমানদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে জিন্নাহ ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন।
ইকবাল তখন আর শুধু কবি ছিলেন না।
তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা মানুষ।
কিন্তু তাঁর স্বপ্নের কেন্দ্রে কেবল একটি ভূখণ্ড ছিল না।
ছিল এমন একটি মুসলিম সমাজ, যে নিজেকে চিনবে, নিজের মর্যাদা বুঝবে এবং ইতিহাসের সক্রিয় নির্মাতা হিসেবে নিজের ভূমিকা গ্রহণ করবে।
মানুষ ইকবাল
এত কিছুর পরও ইকবাল কোনো অতিমানব ছিলেন না।
তিনি ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ।
তাঁর মধ্যে ছিল আকর্ষণ, দুর্বলতা, দ্বিধা, আবেগ, সম্পর্কের জটিলতা এবং ব্যক্তিগত ভুল।
তিনি যেমন গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির মানুষ ছিলেন, তেমনই সৌন্দর্য ও প্রেমের প্রতি সংবেদনশীল একজন কবিও ছিলেন।
এই দুই ইকবালকে আলাদা করে দেখলে তাঁকে বোঝা কঠিন।
কারণ তাঁর কবিতার সৌন্দর্যও এসেছে এই গভীর মানবিকতার মধ্য দিয়ে।
হয়তো এজন্যই তাঁর কবিতায় কখনো প্রেমিকা, কখনো শাহীন, কখনো মরুভূমি, কখনো শিশু, কখনো পাহাড়, কখনো বুলবুল, কখনো জুগনু, আবার কখনো সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একসঙ্গে জায়গা পেয়েছে।
রুমির কাছে ফিরে যাওয়া
ইকবালের আধ্যাত্মিক জীবনে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির প্রভাব ছিল গভীর।
তিনি রুমিকে নিজের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখতেন।
রুমির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু একজন কবির প্রতি আরেক কবির শ্রদ্ধা ছিল না।
ইকবাল রুমির মধ্যে এমন একটি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পেয়েছিলেন, যেখানে আত্মা, কর্ম, প্রেম, জ্ঞান এবং আল্লাহর সন্ধান পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়।
এ কারণেই তাঁর কবিতায় রুমি বারবার ফিরে আসেন।
শেষ অধ্যায়
১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল লাহোরে ইকবালের জীবনাবসান হয়।
বয়স হয়েছিল মাত্র ৬০ বছর।
যে মানুষ সারাজীবন মুসলমানদের জাগরণের কথা বলেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই চলে গেলেন।
কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেকে গেল।
থেকে গেল তাঁর কবিতা।
থেকে গেল ‘খুদি’।
থেকে গেল ‘শাহীন’।
থেকে গেল তাঁর মুসলিম বিশ্বের প্রতি আহ্বান।
থেকে গেল তাঁর প্রশ্ন:
একটি জাতি কি শুধু অতীতের গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে?
নাকি তাকে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই নির্মাণ করতে হয়?
ইকবালের মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছিল। লাহোরের বাদশাহী মসজিদের পাশে তাঁর সমাধি তৈরি করা হয়।
আজও সেই সমাধি দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু ইকবালের প্রভাব শুধু তাঁর সমাধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
উর্দু ও ফারসি সাহিত্যে তাঁর অবস্থান তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। ইরান, তুরস্ক এবং বৃহত্তর ফারসি ভাষাভাষী বিশ্বেও তাঁর কবিতা ও চিন্তার পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
‘ইকবাল লাহোরি’ নামে তিনি সেখানে পরিচিত।
শেষ কথা
ইকবালের জীবনকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
তিনি ছিলেন একদিকে গভীর ধর্মবিশ্বাসী মানুষ, অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শনের নিবিড় পাঠক।
তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক কবি, আবার রাজনৈতিক চিন্তক।
তিনি মুসলমানদের অতীতের কথা বলেছেন, কিন্তু তাঁর চোখ ছিল ভবিষ্যতের দিকে।
তিনি ইউরোপকে দেখেছেন, পশ্চিমের জ্ঞানকে আত্মস্থ করেছেন, কিন্তু নিজের আত্মপরিচয় হারাননি।
তিনি প্রেমে পড়েছেন, ব্যক্তিগত জীবনে দ্বিধায় পড়েছেন, আবার মানুষের আত্মমর্যাদা নিয়ে এমন কবিতা লিখেছেন যা এক শতাব্দী পরও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়।
তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনো একটি রাষ্ট্রের ধারণা নয়।
বরং একটি প্রশ্ন।
মানুষ তার নিজের ভেতরের শক্তিকে কতটা চিনতে পেরেছে?
একটি জাতি নিজের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেললে তাকে আবার কীভাবে জাগানো যায়?
ইকবাল মনে করতেন, পুনর্জাগরণের শুরু হয় মানুষের ভেতর থেকে।
আর সেই কারণেই তাঁর ‘খুদি’ শুধু দর্শনের একটি শব্দ নয়।
এটি ছিল আত্মবিস্মৃত মানুষের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
যে মানুষটি হুক্কার ধোঁয়ার ভেতর একটি মানচিত্র দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হয়তো সেই মানচিত্রের চেয়েও বড় ছিল।
তিনি চেয়েছিলেন মানুষ নিজের হারানো মর্যাদা ফিরে পাক।
চেয়েছিলেন মুসলমান আবার চিন্তা করুক, শিখুক, সৃষ্টি করুক, কাজ করুক।
আর তাঁর জীবনের শেষ প্রার্থনাটি যেন এই সমগ্র আকাঙ্ক্ষারই সংক্ষিপ্ত রূপ:
জীবন যেন প্রদীপের মতো হয়,
যে নিজে জ্বলে এবং অন্যের পথও আলোকিত করে।

Comments
Post a Comment