Skip to main content

মওদুদী কে?


আদালতকক্ষের পরিবেশ তখন উত্তপ্ত।

যেকোনো মুহূর্তে ঘোষণা হতে পারে চূড়ান্ত রায়। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন সাইয়্যিদ কুতুব। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান কঠোর স্বরে প্রশ্ন করলেন,

“এই চিন্তাগুলো কি তুমি আবুল আ’লা মওদুদীর বই থেকে নিয়েছ?”

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কুতুবের মুখে কোনো অস্থিরতা নেই।

তিনি শান্তভাবে বললেন,

“হ্যাঁ। মওদুদীর বই থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি।”

প্রশ্নকর্তার কপালে ভাঁজ আরও গভীর হলো।

“তোমার দাওয়াত আর আবুল আ’লা মওদুদীর দাওয়াতের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?”

কুতুবের উত্তর ছিল আরও সরল,

“কোনো পার্থক্য নেই।”

এরপর আদালতকক্ষে নেমে এলো সেই মুহূর্ত, যখন কয়েকটি শব্দ একটি জীবনের সমাপ্তি ঘোষণা করে।

সাইয়্যিদ কুতুব এবং তাঁর দুই সঙ্গীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।

এই দৃশ্যের বহু বছর আগেও দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি কারাগারে প্রায় একই রকম এক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল।

কারাগারের একটি কক্ষে নামাজ শেষে কয়েকজন বন্দি বসে আছেন। এমন সময় একজন সামরিক কর্মকর্তা ভেতরে ঢুকলেন।

কঠোর স্বরে তিনি জানতে চাইলেন,

“মওদুদী কে?”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এলো,

“আমি, আবুল আ’লা মওদুদী।”

অফিসার হাতে থাকা কাগজটি খুললেন। তারপর পড়ে শোনালেন রায়।

কাদিয়ানি প্রশ্ন নিয়ে লেখার কারণে মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই। তবে গভর্নর জেনারেলের কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া যেতে পারে।

কক্ষটা কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তারপর মওদুদীর কণ্ঠ শোনা গেল,

“আমাকে কারও কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে হবে না। জীবন ও মৃত্যুর সিদ্ধান্ত পৃথিবীতে হয় না, আসমানে হয়। সেখানে যদি আমার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাকে বাঁচাতে পারবে না। আর যদি আমার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমার বাকি জীবন শেষ করতে পারবে না।”

অফিসারের মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। তিনি ঘুরে বেরিয়ে গেলেন।

প্রায় আধা ঘণ্টা পর আবার দরজা খুলল।

কারাগারের কর্মকর্তারা এসে বললেন,

“মওদুদী সাহেব, প্রস্তুত হোন। ফাঁসির মঞ্চে যেতে হবে।”

তিনি বিসমিল্লাহ পড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পোশাক বদলালেন, মাথায় টুপি পরলেন, হাতে কুরআন নিলেন। তারপর সঙ্গীদের সঙ্গে বিদায় নিলেন।

ঘটনাটি দেখে উপস্থিত মৌলানা আমীন আহসান ইসলাহী আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল,

“আমি জানতাম মওদুদী একজন বড় মানুষ। কিন্তু জানতাম না, আল্লাহর কাছে তাঁর মর্যাদা এত বড়।”

শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। কিন্তু কারাগারের সেই দৃশ্য মওদুদীর জীবনে এমন এক অধ্যায় তৈরি করেছিল, যা তাঁকে তাঁর সমর্থকদের কাছে কিংবদন্তির মর্যাদা দেয়।

কিন্তু এই মানুষটি কীভাবে এখানে এসে পৌঁছেছিলেন?

গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে।

১৯০৩ সালে, হায়দরাবাদ দাক্ষিণাত্যের আওরঙ্গাবাদে জন্ম নেন সাইয়্যিদ আবুল আ’লা মওদুদী।

তাঁর পরিবার ছিল ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক সম্ভ্রান্ত পরিবার। বংশের শিকড় ছিল আফগানিস্তানের হেরাতের কাছাকাছি চিশত অঞ্চলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন একটি পরিবেশে বড় হন, যেখানে ধর্ম ছিল জীবনের আলাদা কোনো বিষয় নয়, বরং জীবনেরই অংশ।

উর্দু, ফারসি, আরবি, ফিকহ ও হাদিসের প্রাথমিক শিক্ষা তিনি ঘরেই লাভ করেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে ভর্তি হন আওরঙ্গাবাদের মাদরাসা ফুরকানিয়ায়।

১৯১৪ সালে তিনি মৌলভি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কিন্তু তখনই পরিবারের ওপর নেমে আসে আর্থিক সংকট।

পরিবার আওরঙ্গাবাদ ছেড়ে হায়দরাবাদে চলে যায়। সেখানে তাঁর পড়াশোনা আবার শুরু হয়। দারুল উলুমের সঙ্গে তাঁর শিক্ষাজীবন যুক্ত হয়। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন মৌলানা হামিদুদ্দীন ফারাহী।

কিন্তু পড়াশোনার এই অধ্যায়ও বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

একদিন খবর এলো, তাঁর বাবা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছেন।

এর কিছুদিন পরই তাঁর বাবা মারা গেলেন।

মওদুদীর সামনে তখন ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আরেকটি কঠিন বাস্তবতা এসে দাঁড়াল।

জীবন চালাতে হবে।

তিনি সাংবাদিকতায় প্রবেশ করলেন।

বিজনোরের মদিনা পত্রিকার সম্পাদক হলেন। পরে দিল্লির আল-জামিয়া পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত হন।

কিন্তু সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু জীবিকার পথ ছিল না। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মুসলমানদের ভবিষ্যৎ এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তখন চারদিকে ঘুরছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তার কেন্দ্র হয়ে উঠছিল।

১৯২৫ সালে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে মওদুদী তার বিরোধিতা করেন এবং আল-জামিয়া ছেড়ে দেন।

এ সময় ভারতবর্ষে আরেকটি ঘটনাও তাঁর চিন্তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

শুদ্ধি আন্দোলন মুসলমানদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ছিল। ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠছিল। ইসলামকে এমনকি সহিংসতার ধর্ম হিসেবেও উপস্থাপন করা হচ্ছিল।

এই পরিবেশে দিল্লির জামা মসজিদে মৌলানা মুহাম্মদ আলী জওহর একটি বক্তব্য দেন। তিনি আহ্বান জানান, ইসলামে জিহাদের প্রকৃত ধারণা ও বিধান নিয়ে কেউ যেন বিস্তারিতভাবে লিখেন।

মওদুদী সেই আহ্বান গ্রহণ করলেন।

তখন তাঁর বয়স মাত্র চব্বিশ।

তিনি লিখলেন আল-জিহাদ ফিল ইসলাম।

একজন চব্বিশ বছরের তরুণের লেখা এই বই তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে তোলে। তাঁর লেখার প্রশংসা করেন আল্লামা ইকবালও।

কিন্তু মওদুদীর সামনে তখনও আরও বড় একটি প্রশ্ন ছিল।

শুধু বই লিখে কি মুসলমানদের চিন্তার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব?

তিনি সাংবাদিকতা থেকে ধীরে ধীরে আরও বড় এক বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের দিকে এগিয়ে গেলেন।

হায়দরাবাদ দাক্ষিণাত্যে গিয়ে তিনি ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মুসলমানদের অবস্থাকে আরও কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করলেন।

১৯৩২ সালে প্রকাশ করলেন তর্জুমানুল কুরআন।

এটি শুধু একটি পত্রিকা ছিল না। ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠল এমন এক চিন্তার কেন্দ্র, যেখানে মওদুদী ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় হিসেবে নয়, মানুষের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন।

তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল একটি ধারণা,

ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের বিষয় নয়।

মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে সমাজ, অর্থনীতি, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে।

এই চিন্তা থেকেই ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তাঁর কাছে স্পষ্ট হতে থাকে।

১৯৪১ সালে লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হলো জামায়াতে ইসলামী।

মওদুদীর কাছে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দল ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক আদর্শ কার্যকর হবে এবং যোগ্য ও সৎ মানুষ নেতৃত্ব দেবে।

তাঁর বক্তব্য ছিল, নিজের মত ও মাযহাব অনুযায়ী আমল করা যাবে, কিন্তু অন্যের ওপর নিজের মত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। মতের পার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর ইসলামী লক্ষ্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এরপর ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে গেল।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হলো।

নতুন রাষ্ট্রের সামনে তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন,

এই রাষ্ট্রের সংবিধানের ভিত্তি কী হবে?

ইসলামের ভূমিকা কী হবে?

রাষ্ট্র কি ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোয় চলবে, নাকি ইসলামী নীতিকে তার সাংবিধানিক ভিত্তির অংশ করা হবে?

এই বিতর্কে মওদুদীও সক্রিয় হয়ে উঠলেন।

কিন্তু স্বাধীন পাকিস্তানে তাঁর নিজের পথ সহজ হয়নি।

১৯৪৮ সালে তিনি গ্রেপ্তার হলেন।

কারাগারেও তাঁর অবস্থান বদলাল না। তিনি ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি থেকে সরে গেলেন না।

এরপর এল ১৯৫৩ সাল।

আবার গ্রেপ্তার।

এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।

মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।

যে রায়ের কথা দিয়ে আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত সেই দণ্ড কার্যকর হয়নি। মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তিত হয়ে কারাদণ্ডে পরিণত হয় এবং প্রায় তিন বছর পর তিনি মুক্তি পান।

কিন্তু কারাগার তাঁর চিন্তাকে থামাতে পারেনি।

বরং এই সময়ের মধ্যেই তাঁর লেখা পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে মুসলিম বিশ্বের নানা জায়গায় তাঁর বই পৌঁছাতে থাকে।

তাঁর চিন্তা নতুন প্রজন্মের ইসলামি আন্দোলনগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

কেউ তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা গ্রহণ করল, কেউ তাঁর কুরআন ব্যাখ্যা থেকে প্রভাবিত হলো, কেউ তাঁর ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে তুলল।

কিন্তু এখানেই মওদুদীর জীবনের আরেকটি জটিল অধ্যায় শুরু হয়।

জামায়াতে ইসলামী কি শুধু সমাজ সংস্কারের কাজ করবে?

নাকি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেবে?

দলের ভেতরেই এ নিয়ে মতভেদ তৈরি হলো।

একদিকে মওদুদী ও তাঁর সমমনা ব্যক্তিরা মনে করলেন, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে ড. ইসরার আহমদ, আমীন আহসান ইসলাহীসহ কয়েকজন মনে করতেন, আগে সমাজ ও মানুষের নৈতিক সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত এবং নির্বাচনী রাজনীতির পথ এড়িয়ে চলা উচিত।

শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী রাজনীতির পথ বেছে নিল।

এর ফলে ড. ইসরার আহমদ ও আমীন আহসান ইসলাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সংগঠন থেকে আলাদা হয়ে গেলেন।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক মওদুদীর জীবদ্দশাতেই শেষ হয়নি।

বরং তাঁর মৃত্যুর পরও প্রশ্নটি থেকে গেছে।

একটি বিপ্লবী ও আদর্শভিত্তিক আন্দোলন যখন নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তখন কি তার চরিত্র বদলে যায়?

মওদুদীর সমালোচকেরা এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন।

অন্যদিকে মওদুদী তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে নিজের যুক্তিও দিয়েছেন।

১৯৭৪ সালের এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতা বা নির্বাচনী সাফল্যের জন্য এমন কিছু করা উচিত নয়, যার ফলে মানুষের নৈতিক চরিত্র নষ্ট হয়। মূল কাজ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দেখানো পথে সমাজকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতির ফল ছিল কঠিন।

১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বড় সাফল্যের প্রত্যাশা করেছিল। সংগঠনের সামাজিক প্রভাব ও রাস্তায় তার উপস্থিতি দেখে অনেকেই বড় ফলের আশা করেছিলেন।

কিন্তু নির্বাচনে দলটি মাত্র চারটি আসন পেল।

ইসলামী বিপ্লবের রাজনৈতিক স্বপ্ন তখন বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে ধাক্কা খেল।

এরপর পাকিস্তান নিজেই ভেঙে গেল।

১৯৭২ সালে মওদুদী জামায়াতে ইসলামী আমিরের দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

কিন্তু রাজনৈতিক সাফল্য না এলেও তাঁর কলম থামেনি।

বরং তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সম্ভবত রাজনীতির মাঠে নয়, বইয়ের পাতায়।

আল-জিহাদ ফিল ইসলাম থেকে শুরু করে তর্জুমানুল কুরআন, পর্দা, মাসআলা-এ-মিলকিয়ত, সুদ, ইসলাম ও আধুনিক অর্থব্যবস্থা এবং আরও অসংখ্য রচনা তাঁর চিন্তার বিস্তার ঘটায়।

আর তারপর আসে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি,

তাফহীমুল কুরআন।

উর্দু ভাষায় কুরআনের এই তাফসির সাধারণ শিক্ষিত মুসলমানের কাছে কুরআনের অর্থ ও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করে।

মওদুদীর চিন্তা নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর তাফসিরকেই তাঁর সমগ্র চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন।

কিন্তু সব বই তাঁকে একইভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলেনি।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ খিলাফত ও মুলুকিয়াত।

ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে খিলাফত কীভাবে রাজতান্ত্রিক শাসনে রূপ নিল, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বইটি লেখা হয়েছিল।

বইটি প্রকাশের পর তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।

দেওবন্দি আলেমদের একাংশ আগে থেকেই মওদুদীর সমালোচনা করছিলেন। এই বইয়ের পর তাঁর বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত পরিসরে আপত্তি ওঠে। বেরেলভি ও আহলে হাদিস ধারার আলেমদের মধ্যেও তাঁর সমালোচনা জোরালো হয়।

মওদুদীর চিন্তা তাই কখনোই শুধু প্রশংসার গল্প ছিল না।

তাঁর জীবনের সঙ্গে বিরোধ, বিতর্ক এবং তীব্র সমালোচনাও পাশাপাশি চলেছে।

তবু তাঁর কিছু বই সাধারণ মুসলমানের ইসলাম বোঝার ধরন বদলে দেয়।

দীনিয়াত এবং খুতবাত ছিল তার অন্যতম উদাহরণ।

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ইবাদত ও জীবনব্যবস্থাকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে এই বইগুলো বহু মানুষের কাছে ইসলামকে নতুনভাবে বোঝার দরজা খুলে দেয়।

আর রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি হয়ে ওঠে ইসলামী রিয়াসত।

এখানে মওদুদী ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা, শাসনের নীতি, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর চিন্তা তুলে ধরেন।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলন এই চিন্তা থেকে প্রভাবিত হয় বলে গবেষণা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সঙ্গে মওদুদীর চিন্তার সম্পর্ক নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে।

কিন্তু মওদুদীর প্রভাব শুধু বই পড়া মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী ভারত ও বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে আলাদা সংগঠন হিসেবে বিকশিত হয়েছে। তাঁর চিন্তার প্রভাব মুসলিম বিশ্বের আরও কিছু ইসলামি আন্দোলনেও পৌঁছেছে।

এখানে এসে আবার সেই আদালতের দৃশ্যটির কথা মনে পড়ে।

সাইয়্যিদ কুতুবকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল,

“তুমি কি মওদুদীর বই থেকে শিখেছ?”

তিনি বলেছিলেন,

“হ্যাঁ।”

তবে মওদুদীর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। তাঁর কিছু লেখা পরবর্তী কালের বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলনের চিন্তায় ব্যবহৃত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী সংগঠন বা আন্দোলনের সব কর্মকাণ্ডকে সরাসরি মওদুদীর ব্যক্তিগত অবস্থানের সঙ্গে এক করে দেখা ইতিহাসের দিক থেকে যথার্থ নয়।

বিশেষ করে আফগানিস্তান বা কাশ্মীরের সশস্ত্র আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী বা মওদুদীর সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, তার বড় অংশই তাঁর মৃত্যুর পরের সময়ের ঘটনা।

মওদুদী ১৯৭৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মারা যান। চিকিৎসার জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।

তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনা হয়।

লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা।

একজন মানুষের জীবনের শেষ দৃশ্য যেন আবার একটি প্রশ্ন রেখে গেল।

মওদুদীর আসল উত্তরাধিকার কোথায়?

জামায়াতে ইসলামীতে?

যে দল পাকিস্তানের নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর জীবদ্দশায় প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি?

নাকি তাঁর হাজার হাজার পৃষ্ঠার লেখায়?

তাফহীমুল কুরআনে?

দীনিয়াত ও খুতবাতে?

ইসলামী রিয়াসত কিংবা খিলাফত ও মুলুকিয়াতে?

নাকি আরও গভীরে, একটি ধারণায়?

তিনি ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে দেখেননি। তিনি এমন একটি সময়ের মুসলমানদের সামনে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাষায় উপস্থাপন করেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে একমত হওয়া, তাঁর সমালোচনা করা কিংবা তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সবই পরবর্তী প্রজন্মের আলোচনার অংশ।

কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন।

বিশ শতকের মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে আবুল আ’লা মওদুদীর নাম এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

কারণ তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন হয়তো প্রত্যাশিত নির্বাচনী সাফল্য পায়নি।

কিন্তু তাঁর একটি ধারণা বহু দশক পরও মুসলিম বিশ্বের আলোচনায় রয়ে গেছে।

ইসলাম কি শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ইবাদতের বিষয়, নাকি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক কাঠামো?

এই প্রশ্নটিকে বিশ শতকের মুসলিম সমাজে নতুন রাজনৈতিক ভাষায় সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে সামনে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের একজন ছিলেন সাইয়্যিদ আবুল আ’লা মওদুদী।

আর সম্ভবত এখানেই তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার।

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামী: বিপ্লবী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির গোলকধাঁধা

ইবনে খালদুন: রাজদরবার থেকে সভ্যতার অন্তর্গত সূত্রের সন্ধানে

ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল একটি যুগের প্রতিনিধি নন। তাঁরা তাঁদের সময়কে পেরিয়ে ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেন। ইবনে খালদুন ছিলেন তেমনই একজন। তিনি রাজা ছিলেন না, কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ছিলেন না যুদ্ধজয়ী সেনাপতি। তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল বাহিনী। অথচ রাজদরবার, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাসন, কারাবাস এবং সভ্যতার উত্থান-পতন তাঁকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছিল, যা কোনো পাঠশালায় একা বসে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। তিনি মানুষকে দেখেছিলেন ক্ষমতার খুব কাছে থেকে। দেখেছিলেন কীভাবে একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কীভাবে সম্পদ জমা হয়। কীভাবে করের বোঝা বাড়তে বাড়তে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। কীভাবে বিলাসিতা একটি বিজয়ী জাতির চরিত্র বদলে দেয়। আর কীভাবে যে জনগোষ্ঠী একসময় সাম্রাজ্য গড়ে, কয়েক প্রজন্ম পর তারাই সেই সাম্রাজ্যের ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল ছিল একটি গ্রন্থ। আল-মুকাদ্দিমা। আর সেই গ্রন্থের লেখক আবু যায়দ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন। আজ তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রদূত, ইতিহাসচিন্তার এক বিপ্লবী নাম এবং অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাথমিক পথিকৃৎ হি...

মাঝে মাঝে

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন সীমান্ত সৈনিক কাঁটাতারের বেড়াজাল ছেঁড়া শত্রুর অপেক্ষামান মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন লাইটহাউজ সুউচ্চ মিনার হতে পথহারা নাবিকের আশারআলো; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন ক্রনোমিটার বিচ্ছেদের প্রহর শেষে ফিরে আসার সুচতুর অনুমান। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন পুরনো বই, ধুলোমলিন পড়ে রই টেবিলের এককোণে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন কবিতার খাতা ভুল ব্যাকরণে লেখা তাই পড়েনি কেউ; মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন বৃষ্টি ভেজা রংধনু এক আকাশ মন খারাপ শেষে কারো মন ভালো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন অভিযোগকারী আকাশ পানে চেয়ে রবকে বলি রোজ ভুলতে চাই যন্ত্রনাদের